ঈদ ও সিয়ামের শিক্ষায় বিনির্মিত হোক সুন্দর সমাজ

12:00:00

1156 বার পঠিত


ঈদ ও সিয়ামের শিক্ষায় বিনির্মিত হোক সুন্দর সমাজ

মুসলমানদের জীবনে প্রতি বৎসর দুটি ঈদ নিয়ে আসে আনন্দের ফল্গুধারা। অনেক আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা, মমতা দিয়ে ঈদের এ পবিত্র ও অনাবিল আনন্দ উৎসবে উঁচু-নিচু, ধনী-গরীব, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যেন একাকার হয়ে যায়। কবি ফররুখ এর ভাষায়-”সবাই মিলে একদলে/এক আশাতে যাই চলে/এক আশাতে যাই বলে/ঈদগাহ হবে দুনিয়াটাই”। মুসলমানরা এই দিনটি ধর্মীয় কর্তব্য পরায়ণতার চেতনা নিয়ে সবাই এক ঈদগাহে মিলিত হয়ে খুব ভাবগাম্ভীর্যতার সাথে ঈদ উপভোগ করে। ঈদের দিনকে ফেরেস্তাদের জগতে (আসমানে)” পুরস্কারের দিন” দিন বলা হয়। সা’দ বিন আওস আনসারী (রা.) বর্নিত রাসূল (স.) বলেছেন, যখন ঈদ-উল-ফিতর এর দিন উপস্থিত হয়, তখন আল্লাহর ফেরেস্তাতারা সমস্ত রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে বলতে থাকেঃ হে মুসলমানরা! তোমাদের প্রভুর কাছে চলো, যিনি অতি দয়ালু, যিনি নেকী ও  মঙ্গলের কথা বলেন  এবং সেই মতে আমল করার তৌফিক দান করেন আর এ জন্য বহু পুরস্কার দান করে থাকেন। তাঁর তরফ থেকে তোমাদের রাত্রে তারাবী পড়ার হুকুম করা হয়েছে, তাই তোমরা তারাবী পড়ছো। তোমাদেরকে দিনে রোজা রাখার হুকুম করা হয়েছে, তাই তোমরা রোজা রাখছো এবং প্রভুর আনুগত্য করছো। সুতরাং, চলো নিজ নিজ পুরস্কার গ্রহণ কর। অতঃপর তারা যখন ঈদের নামাজ পড়া শেষ করে, তখন আল্লাহর এক ফেরেস্তা ঘোষণা করেঃ শুনো, তোমাদের প্রভু তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। অতএব তোমরা কামিয়াবী এবং সফলতার সাথে ঘরে ফিরে যাও। (তারগীব ও তারহীক)

কিন্তু ঈদের আনন্দ কাদের জন্য? আসলে ঈদের এ অনাবিল আনন্দ সবার জন্য নয়! কেবল মাত্র আল্লাহর দরবারে যাদের রোজা এবং কুরবানী কবুল হয়েছে ঈদের আনন্দ তাদের জন্য। মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা)-এর খেলাফতের সময় একবার এক ঈদের দিন সকালে ঈদের নামাজের পর সবাই যে যার মতো আনন্দ করছে। নির্জন এক স্থানে খলিফা ওমরকে দেখা যাচ্ছে কান্না করতে। লোকজন খলিফাকে প্রশ্ন করলো আজ ঈদের দিন, আপনি কাঁদছেন কেন? হযরত ওমর জবাব দিলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছিলেন, যে ব্যক্তি জীবনে একবার রমজানের রোযা পেল আর সে ইবাদাত বন্দেগীর মাধ্যমে গুনাহসমূহ আল্লাহর কাছ থেকে মাফ চেয়ে নিতে পারলোনা সে ধ্বংস হোক। এখন রোযা শেষ হয়ে আজকে ঈদের দিন, আমি এখনো জানিনা আমার গুনাহসমূহ মাফ করা হলো কিনা, আমি কিভাবে নিশ্চিন্তে তোমাদের সাথে আনন্দ করতে পারি? তাই গুনাহ মাফের জন্যে আল্লাহর দরবারে কাঁদছি। 

মুমিনরা নিজের সাধ্যের বাহিরে কোন আনন্দ উপভোগ করেনা। একবার ঈদে খলিফার ছেলেরা কাঁদছেন নতুন কাপড়ের জন্য। স্ত্রী জানালে, খলিফা বললেন, “তাঁর সামর্থ নেই!!” স্ত্রী বললেন, আগামী মাসের বেতন থেকে কিছু টাকা নেন। অতপর খলিফা কোষাগারের সচিবের কাছে একজনকে পাঠালেন। সচিব বললেন, “দুটি শর্ত আছে। যদি খলিফা শর্ত পূরণ করতে পারেন, তবে আমি দিতে পারি। ক. আগামী মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন এ নিশ্চয়তা খ. আগামী মাস পর্যন্ত জনগণ তাঁকে খলিফা মানবেন কি? সেই ব্যক্তিটি ওমরের কাছে গিয়ে ঘটনা জানালে ওমর সিজদায় চলে গিয়ে বললেন, “আল্লাহর কুরআন মানুষকে কত পরিবর্তন করেছে। তারা খলিফাকে ভয় না করে আল্লাহকে ভয় করে।”

সাওম আল্লাহকে ভয় করার সর্বোত্তম একটি প্রশিক্ষণ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজাকে ফরজ করা হয়েছে যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপরও ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা পরহেযগার হতে পারো।” (সূরা-বাকারা: ১৮৩)মাসব্যাপি সংযমের মাধ্যমে মুসলমানদের মাঝে সংহতি এনে দেয়, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কষ্ট করার মাধ্যমে সমগ্র মুসলিম জাতি অতি সহজেই অভাবী-অনাহারী মানুষের ক্লেশ অনুভব করতে পারে; যা তাকে অভুক্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে, তাদের খাবার জোগাড়ে তাগিত দেয়। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়- ঈদ উল ফিতর আনিয়াছে তাই নববিধান/ওগো সঞ্চয়ী, উদ্বৃত্ত যা করিবে দান,/ক্ষুধার অন্ন হোক তোমার!/ভোগের পেয়ালা উপচায়ে পড়ে তব হাতে,/তৃষ্ণার্তদের হিসসা আছে ও-পেয়ালাতে,/দিয়া ভোগ কর, বীর দেদার।

কিন্তু আজ রোজা, সাহরী ও ঈদের আনন্দ যেন সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর জন্য নয়! সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, ফিলিস্তিনে ইহুদীদের বর্বোরচিত হত্যাকান্ড, মিয়ানমারের মুসলিম হত্যাকান্ড, স্বাধীনতাকামী কাশ্মীর-ঝিনজিয়াং-মিন্দানাওয়ের মুসলিম নির্যাতন মুসলিম বিশ্বের ঈদ আনন্দকে বেদনাবিধুর করে তুলেছে। বর্তমান মুসলিম বিশ্বের সর্বত্রই আজ শুধু হাহাকার আর আহাজারীতে পূর্ণ। নিষ্পেষনের শিকার বৃদ্ধ,নারী, পুরুষ ও শিশুরা। আমাদের দেশের একপ্রান্তে বাস্তুভিটা হারা রোহিঙ্গারা আজ উন্মুক্ত ময়দানে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে মানবতাবোধ যেন নির্বাসিত। ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার নির্বোধ, নিষ্পাপ শিশুদের বুকে তাজা রক্ত ঝরাচ্ছে মানবতার লেবাসধারী শকুনেরা। রঞ্জিত হচ্ছে ধূসর মরু ভূমির উত্তপ্ত ময়দান, বধ্যভূমিতে বিধবার বোবা কান্নায় গুমরে-মুচরে আতত্নহুতিদানকারী লাশের মিছিল। মুসলমানদেরকে নিজ জন্মভূমি থেকে উৎখাত করে সেখানে দানবীয় রাজ্য কায়েম করছে দখলবাজরা। আবার এর পৃষ্ঠপোষকতা দিতে বিশ্বমোড়লেরা। ধিক! মানুষরূপী পশুদের এই হিং¯্র পৈশাচিক অসভ্য বর্বরতাকে। 
এদেও মোকাবেলায় মুমিনদেও করনীয় সম্পর্কে আল্লাহ বলেন “তোমাদের কি হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহ তায়ালার পথে, সেইসব অসহায় নারী পুরুষ ও শিশুদের রক্ষার জন্য লড়াই করছো না, যারা দুর্বল হওয়ার কারণে নিপীড়িত হচ্ছে এবং ফরিয়াদ করছে যে, হে খোদা আমাদেরকে এই জনপদ থেকে বের করে নাও, যার অধিবাসীরা জালিম এবং তোমার কাছ থেকে আমাদের জন্য পরিত্রাণকারী কোন বন্ধু বা সাহায্যকারী পাঠাও (সুরা নিসা:৪:৭৫) আল্লাহর তায়ালার সমাজের মজলুম, অসহায় ও বঞ্ছিতদের স্বার্থ রক্ষায় এগিয়ে আসতে বলেছে সকলকে।

পশ্চিমারা মুসলমানদের আজ সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের এক পরিসংখ্যান বলছে, গত ৫ বছরে ধর্মের নামে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো যে সন্ত্রাস ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তাতে দেশগুলোতে  ৮৭থেকে৯৭ভাগ মুসলমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০০৯সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি একাডেমির কাউন্টার টেররিজম সেন্টার এক প্রতিবেদন বলে আল-কায়েদা অমুসলিমদের চেয়ে ৭ গুণ বেশি মুসলিমকে হত্যা করেছে। ২০১৫সালে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয় ইরাকে আইএস জঙ্গিরা সবচেয়ে বেশি মুসলিমকে হত্যা করছে। মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল টেররিজম ডাটাবেজ তথ্য দিচ্ছে ২০০৪ থেকে  ২০১৩ পর্যন্ত পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরাকে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ ৬০ভাগ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং এ তিনটি দেশই মুসলিম প্রধান। বস্তত : মুসলিম মানব সভ্যতার ধ্বংস সাধন ও মুসলমানদের  উত্থান ও অগ্রসরতা রোধ করতে যেন সব আয়োজন। ফিলিস্তিন,কাশ্মীর, আলজেরিয়া, ও মিশর তার সবচেয়ে বড় প্রমান।

৯০% মুসলমানদের দেশেও ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরাসহ সব শ্রেণী পেশার মানুষেরা চরম নির্যাতনের শিকার। ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে যেন আজ পৃথিবীর সব চেয়ে বড় কারাগার!। স্বৈরাচারী আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে জনগণ আজ অতিষ্ঠ। হত্যা, সন্ত্রাস, অপহরণ, গুম ও খুনের যেন এখন হোলি খেলার মত!। সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের ধোয়া তুলে ইসলামপ্রিয় জনতাকে দমনের অপচেষ্টা চলছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে দূরভীসন্ধিমূলকভাবে দলীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে দেশকে ধর্মহীন রাষ্ট্রে পরিণত করার অপচেষ্টা চলছে অত্যন্ত সুকৌশলে ও জঘন্যভাবে। 
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে কারাগারে বন্দি শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। ঘর-বাড়ী ছাড়া নিপীড়িত নেতা-কর্মীদের পরিবারের ঈদ কাটে নিরানন্দে। হত্যা, খুন, গুম হওয়া পরিবারের ঈদ আনন্দের পরিবর্তে ঈদ আসে দু:খ-কষ্ট আর বেদনা নিয়ে। শাহাদাত ও গুম অপহরণের শিকার প্রিয়জনদের অনুপস্থিতি যেন ঈদের আনন্দ তাদের কষ্টের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। 

রাসূল (সাঃ) একবার বলেছেন, “সকল ঈমানদারের একই শরীর, শরীরের কোন অংশে আঘাত লাগলে যেন পুরো শরীরে আঘাত অনুভব করে তেমনি একজন ঈমানদার আঘাত পেলেও পুরো মুমিন সমাজ আঘাত অনুভব করবে।” কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়-“জীবনে যাদের হররোজ রোজা /ক্ষুধায় আসেনা নিদ,/মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে/এসেছে কি আজ ঈদ?/একটি বিন্দু দুধ নাহি পেয়ে/যে খোকা মরিল তার উঠেছে/ঈদের চাঁদ হয়ে কি সে শিশু-পুঁজরের হাড়?”

মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-“মুমিনরা তো আসলে পরস্পরের ভাই (কুরআন ৪৯-১০)” এবং “মুমিন এবং মুমিনা পরস্পরের সাহায্যকারী এবং রক্ষক (সুরা তাওবা- ৯:৭১)”  পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যরে বিষয়ে তাগিদ দিয়ে রাসূল (স.) অনেক হাদিস রয়েছে। “কোন ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার নয় যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে নিজের ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করবে।” সে ব্যক্তি নিজেকে ঈমানদার দাবি করতে পারেনা যে প্রতিবেশীকে অভূক্ত রেখে নিজে পেট পুরে ঘুমাতে যায় ” “তোমরা তোমাদের ভাইদের মজলুম  এবং জালিম উভয় অবস্থায়  সাহায্য করো।” 
ইসলামের এই সাম্যবাদী সুন্দর নীতিকে পাশ্চাত্যের বহু মনিষীও স্বীকার করেছেন। বিশেষভাবে আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ ও আফ্রিকানদের মাঝে ইসলামের দ্রুত প্রসারের জন্য ইসলামের সাম্যবাদীর নীতির উল্লেখ্য। আল্লাহ তায়ালা একটি আয়াতের মাধ্যমে ইসলাম গোটা মানবজাতিকে সমমর্যাদায় এনে দিয়েছে; “হে মানবজাতি; আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি, অতঃপর বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠিতে বিভক্ত করেছি। 

মুসলিম সমাজগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে ইসলামের এই সাম্যবাদের দর্শণ এর বাস্তবায়ন ও প্রতিষ্ঠা করা। বাহ্যিক ব্যবহারে, আইন প্রণয়নে ও সরকারের আইন প্রয়োগের মাধ্যমে। মুসলমানদেরকে সামাজিক-রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচন করার মাধ্যমে সমাজে ন্যায় -ইনসাফ ও মানবিক সমাজ বির্নিমান করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যাতিত ইসলামের আসল সুন্দর্য ও কল্যান মানুষ উপভোগ করতে পারবেনা। এজন্য মিশরের তৎকালিন বাদশা যখন ইউসুফ (আঃ)-এর চারিত্রিক সততায় মুগ্ধ হলেন, তখন ইউসুফ (আ:) প্রতি উত্তরে বললেন, “আপনি আমাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের দায়িত্ব প্রদান করুন আমি সততার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করবো।”
ইসলামের এমন সুফল বিশ্ব মানবতার যেন ভোগ করতে পাওে সে ব্যাবস্থা আমাদেরকে করতে হবে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বষ্ণিত, মিসকিনকে দান করতে বলে, এতিম ও বিধবাদের ভরণপোষণ দিতে বলে; বিনয় ও ভদ্রতার সাথে মানুষের সাথে ব্যবহার করতে উদ্ভুদ্ধ করে; মজলুমকে রক্ষা করতে বলে, ক্রীতদাসকে মুক্তি দিতে বলে, ক্রীতদাসের মুক্তি মূল্য প্রদানে সাহায্য করতে বলে; তখন কোথাও মজলুমের ধর্ম পরিচয়ের কথা উল্লেখ করেনি। 

আল কুরআন মুসলমানদেরকে শ্রেষ্ঠ উম্মাত (খাইরা উম্মাতিন) বলে সম্বোধন করেছেন; এই শ্রেষ্ঠ উম্মাত কিসের গুণে? একমাত্র এবং একক খোদার আনুগত্যের কারণে? নাকি সঠিক ধর্ম অনুস্মরণের কারণে? না এগুলো জন্য নয়। কুরাআনই শ্রেষ্ঠ উম্মাতের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ- তা হচ্ছে ”মানব জাতির কল্যাণের জন্য তোমরা নিবেদিত” সেটা সত্যকে ধারণ করে এবং অসত্য অন্যায়কে প্রতিহত করে জালিমের জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই করার মাধ্যমে এই ”মানবজাতির কল্যাণ” অর্জিত হবে। 
মুসলমাদের নিকট কত রমজান আসে যায় কিন্তু তাদের ভাগ্য যেন পাল্টায়না! মুসলমানরা ক্ষুধা দারিদ্রতা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। ইসলাম এসেছে মানবতাকে মুক্তি দিতে। অথচ মুসলমানেরা শুধু শোষণ বঞ্ছনা, লাঞ্ছনা অপমান হচ্ছে। ইসলাম এসেছে মুসলমানদের শাসকের আসনে বসিয়ে সম্মান, মর্যাদা, ইনসাফ মানবিক গৌরবোজ্জল সমাজ বিনির্মাণ করতে। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন আমাদের কাছে আছে, তাহলে আসল সংকট কোথায়? তা আবিস্কার করতে হবে আমাদেরকে। আল্লাহ বলেন-”(হে নবী) আমি (এ) কোরআন এ জন্য নাযিল করিনি যে, তুমি (এর দ্বারা) কষ্ট পাবে।, এ(কুরআন)তো হ্েচছ বরং ( কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার) একটি (উপায় ও ) নসিহত মাত্র- সে ব্যক্তির জন্য, যে (আল্লাহ তায়ালাকে) ভয় করে।  (সুরা ত্বোহা-২-৩)

মুসলমানরা আজ কুরআনের জ্ঞান ছাড়া দুনিয়ার যাবতীয় সব জ্ঞান রপ্ত করেছে। মানুষ কুরআনের হুকুমের আমল না করে, তথাকথিত পীর-বুজুর্গ, ভন্ডদের হুকুম তামিল করছে। তাবেদারী করছে এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো, এটাই আসল সমস্যা। মজলুম মানবতার মুক্তির জন্যই এই রমজান মাসেই আল্লাহ তায়ালা সব আসমানি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল-কোরআন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর ওপর এই রমজান মাসেই অবতীর্ণ করেছেন, আর মানুষকে দিয়েছেন খেলাফতের দায়িত্ব। কিন্তু যত দিন মুসলমানরা নেতৃত্বের আসনে ছিলো ততদিন তারা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলো। মুসলমানরা আজ নেতৃত্বের আসন থেকে ছিটকে পড়েছে। কারণ তারা আল্লাহর রাহে সংগ্রাম বাদ দিয়ে আরাম আয়েশ গিয়ে গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ হয়েছে। 

”মূলত পৃথিবীর সমগ্র নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিরা যদি আল্লাহর অনুগামী, সৎ ও সত্যাশ্রয়ী হয়, তবে সেই সমাজের লোকদের জীবনের সমগ্র গন্ডী ও ব্যবস্থাই আল্লাহভীতি, সার্বিক কল্যাণ ও ব্যাপক সত্যের উপর গড়ে উঠবে। অসৎ ও পাপী লোকও সেখানে সৎ ও পুণ্যবান হতে বাধ্য হবে। কল্যাণ ও সৎ ব্যবস্থা এবং মঙ্গলজনক রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠানের, উৎকর্ষ ও বিকাশ লাভ করবে। অন্যায় এবং পাপ নিঃশেষে মিটে না গেলেও অন্তত তা ক্রমবর্ধনশীল এবং বিকশিত হতে পারবে না। কিন্তু নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যদি আল্লাহদ্রোহী, ফাসেক, পাপী ও পাপলিপ্সু লোকদের করায়ত্ত হয়, তবে গোটা জীবনব্যবস্থায়ই স্বতস্ফূর্তভাবে আল্লাহদ্রোহিতা জুলুম, অন্যায়, অনাচার ও অসচ্চরিত্রতার পথে চলতে শুরু করবে। চিন্তাধারা আদর্শ ও মতবাদ জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-শিল্প ও রাজনীতি, অর্থনীতি, সভ্যতা ও সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠান, নৈতিক চরিত্র ও পারস্পরিক কাজকর্ম বিচার ও আইন সমষ্টিগতভাবে এ সবকিছুই বিপর্যস্ত হবে। অন্যায় ও পাপ ফুলে-ফলে সুশোভিত হবে। আল্লাহর এই পৃথিবী অত্যাচার জুলুম, শোষণ ও নিপীড়ন-নিষ্পেষণের সয়লাব ¯্রােতে কানায় কানায় ভরে যাবে।

এ জন্য আল্লাহ প্রদত্ত দীন ইসলামের সর্বপ্রথম নির্দেশ এই যে, দুনিয়ার সকল মানুষ নিরঙ্কুষভাবে একমাত্র আল্লাহর দাস হয়ে জীবনযাপন করবে। আল্লাহর দাসত্ব ছাড়া অন্য কারো দাসত্বের শৃঙ্খল থাকবে না। আল্লাহর দেয়া আইনকেই মানুষের জীবনের একমাত্র আইন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। পৃথিবীর বুক হতে সকল অশান্তি ও বিপর্যয় নির্মূল করতে হবে, পাপ ও অন্যায়ের মূলোৎপাটন করতে হবে। তাই ইসলামে জিহাদের উপর এতো অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।  জিহাদ হতে বিরত থাকলে কুরআন মজিদ তাকে ‘মুনাফিক’ বলে কেন অভিহিত করে? আল কুরআন শরীফে মুসলমানের ঈমান পরীক্ষার জন্য এই জিহাদকেই চূড়ান্ত মাপকাঠি বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আর এই কাজে এই ব্যাপারে কারো কুণ্ঠা ও ইতস্ততভাব প্রকাশিত হলে তার ঈমান সংশয়ের মধ্যে পড়ে যায়। ফলে অন্য হাজার ‘সওয়াবের’ কাজও তাকে কোনো কল্যাণদান করতে সমর্থ হয় না”।

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, ‘নবী করিম (ﷺ) বলেছেন, সারা দুনিয়ার মানুষ আমার হয়ে যাওয়ার চেয়ে আল্লাহর রাস্তায় মৃত্যুবরণ করা আমার কাছে অধিক প্রিয়।’ (নাসায়ি) আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন যারা সারিবদ্ধভাবে সিসা নির্মিত দেয়ালের মতো মজবুতভাবে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে।’

মানবতার মু্িক্ত নিশ্চিত করতে হলে আল-কোরআনের সমাজ বিনির্মাণে আমাদের জান ও মাল উৎসর্গ করতে হবে। সত্যিই এ ধরায় যদি দ্বীন কায়েম হয় তাহলে মানবতার জয়গানে মহীরূহ হবে এই বিশ্বময়। দূর হবে অন্যায়-জুলুম, হানাহানি, হিংসা-বিদ্বেষ, উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ। 

আমাদের পাশবিক প্রবৃত্তি দমনের জন্যই রোজা প্রবর্তন করা হয়েছে। রোজা মুসলমানদের চিন্তায় ও কর্মে তথা লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, প্রত্যেকটি কাজে সার্বক্ষণিক আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি পয়দা করে। জীবনের প্রত্যেকটি দিক ও বিভাগ আল্লাহর আইন মোতাবেক সমস্যার সমাধানের অন্যতম শিক্ষা গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু রমজান শেষ হলে সেই অনুভূতি লোপ পেয়ে না যায়। 

রাসুল (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, “রোজা রেখে কেউ যদি মিথ্যা কথা বলা ও তদনুযায়ী কাজ করা ছেড়ে না দেয়, তবে শুধু খাদ্য পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। আর মিথ্যা হলো সকল অপরাধের মা। রোজার উদ্দেশ্য হলো ক্রোধ, লোভ, মিথ্যা, অন্যায়, অবিচার, ত্যাগ করানো। মায়া, মমতা, আত্মত্যাগ, ন্যায়নীতি, সংযত ইনসাফ, সমবেদনা, মাখলুকের সেবা একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করার যোগ্য করে নিজেকে গড়ে তোলা। এর মধ্য দিয়ে পয়দা হয় ভয় ও আমানতদারি। ফলে সমাজের সুখ-সমৃদ্ধি, সুশৃঙ্খলতা, উন্নতির ধারা সূচিত হয়।

এটা কেবল একদিনেরই অনুশীলন নয়, এ ধরনের ট্রেনিং মাত্র একটি দিন কাটিয়েই যথেষ্ট নয়। ক্রমাগত নিরবচ্ছিন্নভাবে দীর্ঘ ৩০ টি দিন মানুষই মানুষের খুদীকে এমনি ট্রেনিং ও অনুশীলনের মধ্যেই অতিক্রম করতে হয়। এ মোতাবেক সমস্যার সমাধানের অন্যতম শিক্ষা গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু রমজান শেষ হলে সেই অনুভূতি লোপ পেয়ে না যায়।

আসুন, রমজানের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে, নিজেদের জীবনকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার মাধ্যমে সমাজকে আল-কোরাআনের আলোয় উদ্ভাসিত করি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে। সিয়ামের শিক্ষায় নির্মান করি একটি সুন্দর সমাজ। এটাই হোক মুসলিম উম্মাহর অঙ্গীকার।কবি মতিউর রহমান মল্লিক-এর ভাষায়-“ঈদের খুশী অপূর্ণ রয়ে যাবে ততদিন /খোদার হুকুমাত হবে না কায়েম /কায়েম হবে না যতদিন।” 

সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা