প্রেরনার অগ্রভাগে শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী--- ড.মুহাম্মদ রেজাউল করিম

12:00:00

998 বার পঠিত


প্রেরনার অগ্রভাগে শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী--- ড.মুহাম্মদ রেজাউল করিম

শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন ছিলেন আল্লাহ প্রদত্ত অসংখ্য মেধার একটি প্রস্ফুরণ। তিনি ছিলেন বিশ্বনন্দিত ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম নেতা, মুসলিম উম্মাহর বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর, একজন অভিবাবক,আন্তার্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার, থিংকার, লেখক-গবেষক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর, সাবেক সফল মন্ত্রী। অসংখ্য আলেম ও ইসলাম প্রিয় জনগণের রুহানি উস্তাদ ছিলেন তিনি। “দ্যা রয়েল ইসলামিক স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টার” প্রকাশিত বিশ্বের প্রভাবশালী মুসলিম ব্যক্তির তালিকায় তিনি ছিলেন অন্যতম। ব্যক্তিগত জীবনে শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, মার্জিত, পরিশীলিত, মৃদুভাষী এক অসাধারণ ইসলামী ব্যক্তিত্ব। নরমদিল, অমায়িক ব্যবহার, ও স্বচ্ছ চিন্তার অধিকারী, সরল জীবন-যাপনে অভ্যস্ত এই মানুষটি কখনো কারো সাথে রূঢ় আচরণ করেছেন কিংবা কাউকে সামান্য কোন কটু কথা বলে আঘাত দিয়েছেন এমন কোন নজির নেই। সুদীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরের রাজনৈতিক জীবনে দেশবাসীর কল্যাণে নিবেদিত মাওলানা নিজামীর ব্যক্তিত্ব দেশবাসীর হৃদয়ে তাদের প্রিয় নেতা স্থান করে নিয়েছে। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে মাওলানা নিজামীর বলিষ্ঠ ভূমিকা বাংলাদেশের মর্যাদাকে বহির্বিশ্বের কাছে উজ্জ্বল করেছে। তিনি ছিলেন দূর্নীতিমুক্ত ও ইনাসফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের সংগ্রামে অগ্রসেনানী। 

শহীদ নিজামী ১৯৯১ এবং ২০০১ সালে মোট দুইবার তিনি বিপুল ভোটে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি কৃষি ও শিল্পমন্ত্রী হিসাবে সর্বমহলে নিজেকে একজন সৎ, দক্ষ ও অমায়িক নেতার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। মেধা ও নৈতিকতা সমন্বয়ে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবার জন্য ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে সংগ্রাম করে আসা মজলুম নেতা শহীদ নিজামী। জেল-জুলুম, নির্যাতন আর রক্তাক্ত পথ পাড়ি দিয়ে তিনি অন্যায়ের সামনে মাথা না নোয়াবার প্রতিক হয়ে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেছেন। ১০ মে রাত ১২টা ১০ মিনিটে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী মহান রবের পানে চলে যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। 

বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রাম, শিক্ষা আন্দোলন, বিরাজনীতিকরণের ষড়যন্ত্র, কেয়ার-টেকার সরকার আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে তিনি আপষহীন বীরপুরুষ। মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা সংগ্রামে জীবন বাজি রেখে সর্বদা সোচ্চার থেকেছেন তিনি। এদেশের মানুষের তাহজীব-তামুদ্দুন, ধর্ম-বর্ণ, নির্বিশেষে সবার অধিকার রক্ষার আন্দোলনে তিনি আছেন প্রথম কাতারে। এ তাঁর জীবননাশের চেষ্টাও হয়েছিল অনেকবার। নাস্তিকতাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের রক্তচক্ষু মোকাবেলা করে আসা একজন সংগ্রামী প্রাণপুরুষ তিনি। নীতির প্রশ্নে সদা আপোষহীন এই মানুষটি কেবলমাত্র ইসলামী আন্দোলন করার আপরাধে-ই হত্যা করা হয়েছে। 

ফ্রান্সিস বেকন বলেছে-” সত্য বলার স্বাধীনতা পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর ও মূল্যবান জিনিষ”। বর্তমান ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী সরকারের সে রোশানলে পড়ে তিনি প্রায় ৬ বছর ছিলেন কারাগারের চার দেয়ালে বন্দী। তাঁর ক্ষুরধার লেখনি, সুনিপুণ বক্তব্য এদেশের তরুণ সমাজকে আলোড়িত করবে শতাব্দীর পর শতাব্দী। তিনি এদেশের ইসলাম প্রিয় জনতার মনে জাগরুক থাকবেন সদা সর্বদা। ব্যাক্তি,পরিবার, সমাজ,রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত তাঁর সুনিপুন লেখনি চিন্তা,বক্তব্যে খুঁজে পাবে পথের দিশা। এদেশের তরুন প্রজন্ম নিজেদেও গরজেই শহীন নিজামীকে ভালবাসবে অনন্তকাল। 

তাঁর ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা, নিষ্ঠা-আন্তরিকতা ও দেশ প্রেমের মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছেন একটি সফল প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্র পরিচালনায় মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সততা, দক্ষতা ও দেশ প্রেমের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ দূর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন তা সত্যিই বিরল। যিনি বারবার বিশ্বের গণ্যমান্য ব্যক্তিত্বের তালিকায় স্থান পেয়েছেন নিজ গুনে। এই অহংকার বাংলাদেশের জনগণের। মুলত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও ইসলামের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার কারণে আধিপত্যবাদ ও নাস্তিকতাবাদী গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে বহুমুখী ষড়যন্ত্র শুরু করে। 

শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর অপরাধ হলো, তিনি ইসলামী আন্দোলনের নেতা ছিলেন, ছিলেন নীতির প্রশ্নে আপসহীন। তাঁর রাজনীতি ছিল ব্যক্তি ও দলীয় সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে। তিনি ছিলেন দেশের জনগণ ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থের পক্ষে। বাংলাদেশকে যারা তাঁবেদার রাষ্ট্র বানাতে চায় তাদের অবৈধ স্বার্থ হাসিলের পথে মাওলানা নিজামী ও তাঁর দল জামায়াতে ইসলামীকে তারা প্রধান বাধা হিসেবে ধরে নিয়েছে। সে জন্য পরিকল্পিতভাবে সর্বজন শ্রদ্ধেয়, গণমানুষের প্রাণপ্রিয় এ নেতাকে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে মিথ্যা অভিযোগ ও সাজানো সাক্ষীর ভিত্তিতে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে হত্যা করেছে। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংগঠন, শীর্ষ ইসলামী ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন দেশের সমালোচনা ও ফাঁসি কার্যকর না করার অনুরোধ উপেক্ষা করে নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করে ফ্যাসিষ্ট জুলুমবাজ সরকার। তাঁর মতো পরিচ্ছন্ন ও বর্ষীয়ান একজন রাজনীতিবিদের রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ডের শিকার হয়ে বিদায় নেয়া সত্যিই উদারতা ও সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য বেদনাবিধুর, লজ্জাজনক ও দুঃখজনক। মাওলানা নিজামীর এই ফাঁসি মুসলিম উম্মাহর দেহে যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, তা বর্তমান আওয়ামী সরকার কর্তৃক পরিকল্পিত এক অমার্জনীয় ও নজিরবিহীন ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে শতাব্দীর পর শতাব্দী। দেশের তরুণ প্রজন্ম এ জমীনে দ্বীন কায়েমের মাধ্যমে শহীদেও রক্তের বদলা নিবে,ইনশাআল্লাহ। 

শাহাদাতের পূর্বে কারাগারের শেষ পরিবারের সদস্যদেও সাথে সাক্ষাতে তিনি যে দৃঢতা,অবিচলতা, দেখিয়েছেন এটি কেবলমাত্র মুমিন বান্দাদেও পক্ষেই সম্ভব তা তাঁরা দেখিয়েছেন।  তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন- ”আজ থেকে তুমি ওদের বাবা ও মা দুটোই। তোমার মাঝে যেন ওরা আমাকে দেখতে পায়। আর তুমিও আমাদের সন্তানদের মাঝে আমাকে খুঁজে পাবে। সন্তানদেও বললেন“তোমরা ভাইবোনেরা মিলেমিশে থাকবে, আল্লাহ ও রাসূলের (সা:) পথে চলবে, মায়ের খেদমত করবে। তোমরা তোমাদের মায়ের মাঝেই আমাকে খুঁজে পাবে। আর তোমাদের আম্মা যেন তোমাদের মাঝে আমাকে খুঁজে পায়। তোমরা তোমাদের আব্বুকে যেভাবে দেখেছো সেটাই মানুষকে বলবে, আমার ব্যাপারে বাড়তি কথা বলা থেকে বিরত থাকবে। আমরা বয়স এখন ৭৫ বছর, আমার সহকর্মীদের অনেকেই আমার মত লম্বা হায়াত লাভ করে নাই, তোমরা তোমাদের বাবাকে দীর্ঘদিন পেয়েছ, হায়াত মাউত আল্লাহর হাতে, আমার মৃত্যু যদি আল্লাহ আজকে রাতেই লিখে রেখে থাকেন তাহলে বাসায় থাকলেও মৃত্যু হত। সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখবে আর শুকরিয়া আদায় করবে”। ছেলে বললেন-”আব্বু দেখেন আপনার তিন নাতীর নাম আপনার নামের সাথে মিল রেখে রাখা। দোয়া করবেন যেন তারা আপনার মত হতে পারে। আব্বু বলেন, “দোয়া করি ওরা যেন আমার চেয়েও অনেক বড় হয়, নবীর সাহাবাদের মত হয়।”  শহীদ নিজামী বললেন, “ফয়সালার মালিক আল্লাহ, তোমরা তো শুধু চেষ্টাই করতে পার। আমার চেয়ে বয়সে ছোট অনেক সাথীই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। আল্লাহ তো আমাকে অনেক আগেই দুনিয়া থেকে নিয়ে যেতে পারতেন। কোন যুদ্ধ না করেও যদি আল্লাহ শহীদী মর্যাদা দিতে চান সেটাতো পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার।”  সন্তানরা বললেন-”আমাদের জন্য কাল কেয়ামতের দিনে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন, যেন আমরা জান্নাতে যেতে পারি। আব্বু বলেন, “তোমরা জান্নাতে যাওয়ার মত আমল কর, তাহলে ইনশাআল্লাহ জান্নাতে যেতে পারবে।”

এরপর মহান রবের দরবাওে মুনাজাতে তিনি বললেন-“হে আল্লাহ আমি তোমার এক নগণ্য গুনাহগার বান্দাহ, তুমি আমাকে যতটুকু তোমার দ্বীনের খেদমত করার তাওফিক দিয়েছো তা মেহেরবানি করে কবুল করে নাও। আমাকে ইসলাম ও ঈমানের উপর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টিকে থাকার তাওফিক দাও আর শাহাদাতের মৃত্যু দান কর। হে আল্লাহ তুমি আমাকে আর আমার বংশধরদেরকে নামায কায়েমকারী বানাও আর আমাকে আমার পিতামাতাকে আর সকল মুমিনদেরকে কাল কিয়ামতের দিনে ক্ষমা কর। 
 হে আল্লাহ আমাদেরকে পরিপূর্ণ ঈমান দান কর, তোমার উপর সত্যিকারের ভরসা করার তাওফিক দান কর। আমাদের জিহবাকে তোমার সার্বক্ষণিক জিকিরকারী বানাও। আমরা তোমার কাছে, তোমার ভয়ে ভীত অন্তর, উপকারী জ্ঞান, হালাল প্রশস্ত রিজিক, সুস্থ বুদ্ধি ও দ্বীনের সঠিক বুঝ ভিক্ষা চাচ্ছি। হে আল্লাহ আমাদেরকে মৃত্যুর পূর্বে তওবা করার তাওফিক দাও, মৃত্যুর সময় আরাম দান কর, মৃত্যুর পরে তোমার ক্ষমা লাভ করার তাওফিক দাও ও দোযখের আগুন থেকে রক্ষা কর। হে আল্লাহ তোমার হালালকৃত জিনিসের মাধ্যমে হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দাও, তোমার আনুগত্যের মাধ্যমে তোমার নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দাও আর আমাদেরকে তুমি ছাড়া কারও মুখাপেক্ষী করো না। আল্লাহ তোমার নূর দিয়ে আমাদেরকে হেদায়াত দান কর। আমাদের সকল গুনাহ খাতা তোমার সামনে পরিষ্কার, তোমার কাছেই ক্ষমা চাচ্ছি ও তোমার নিকট প্রত্যাবর্তন করছি। ইয়া হান্নান ইয়া মান্নান।”  তিনি আরও দোয়া করেন, “হে আল্লাহ তুমি এই দেশকে তোমার দ্বীনের জন্য কবুল করে নাও, এই দেশের জন্য শান্তির ফয়সালা করে দাও। এ দেশকে গুম, খুন, রাহাজানি ও আধিপত্যবাদীদের হাত থেকে রক্ষা কর”। জীবনে অনেকবার তাঁর আবেগধর্মী এ মুনাজাতে আমরা অংশ নিয়ে আমীন,আমীন বলেছি! এখন আমাদেও ফরিয়াদ আল্লাহ আমাদেরকে তাঁদেও জান্নাতে একত্রে থাকার সুযোগ কওে দিও। মোনাজাত শেষে তিনি আদরের সন্তান মোমেনকে জিজ্ঞাস করেন, তিনি ফাঁসির মঞ্চে লুঙ্গি পরে না পাঞ্জাবি-পাজামা পরে যাবেন? মোমেন বলে, পাঞ্জাবি-পাজামা পরে যাবেন।

সাক্ষাতের শেষ পর্যায়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন সাঁথিয়ায় দাফন করতে কে কে যাবে? ডা: খালিদ বললেন আমি আর মোমেন যাব। তিনি তার স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে সাবধানে যেতে বললেন আর মিঠু ভাইকে সাথে রাখতে বললেন। আম্মাকে রাতে সাঁথিয়া যেতে মানা করলেন। মোমেনকে জানাযার নামাযের ইমামতি করতে বললেন। মোমেন প্যান্ট শার্ট পরে ছিল, তিনি বললেন পাঞ্জাবি পরে জানাযা পড়াতে। শহীদ মতিউর রহমার নিজামীর শেষ নসিহত- তিনি সবাইকে কুরআন-হাদীস মেনে চলার ও আল্লাহ ও তার রাসূলের (সা:) পথে চলার উপদেশ দেন। যে কোন পরিস্থিতিতে সবর করার ও আল্লাহর উপর রাজি খুশি থাকতে বলেন। আমার পরিষ্কার খেয়াল নেই উনি এই সাক্ষাতে নামাযের ব্যাপারে আলাদাভাবে বলেছেন কিনা তবে আগের প্রায় প্রতিটি সাক্ষাতে তিনি নামাযের ব্যাপারে বিশেষ তাগাদা দিতেন। এরপর উনি বলেন আমার অসিয়তগুলো তোমরা আমার লেখা বইগুলোতে পাবে। বিশেষ করে জেলে বসে লেখা দুটি বই- কুরআন হাদীসের আলোকে রাসূল মুহাম্মদ (সা:) ও আদাবে জিন্দেগী এবং আগে লেখা বই কুরআনের আলোকে মুমিনের জীবন’ প্রভৃতি বইগুলো পড়তে বলেন।  সবশেষে মেয়ে মহসিনা কে বললেন, “আম্মু আমি তোমাকে নিয়ে বেশি চিন্তিত, তুমি আমার মা, আমার সবচেয়ে বড় সন্তান, তোমার মুখেই প্রথম আমি আব্বু ডাক শুনেছি। তুমি শান্ত থেক।” আম্মুকে বললেন, “আমার সোনার টুকরা ৬ ছেলে-মেয়েকে রেখে গেলাম তুমি এদের মাঝেই আমাকে খুঁজে পাবে। তোমরা যাও, আমি তোমাদের যাওয়া দেখি।” 

ছেলে ডা: খালিদ লিখেছেন-”আমরা একে একে হাত মিলিয়ে আমাদের জান্নাতী বাবার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। ছোট্ট বিড়ালটিও আমাদের পিছু নিল। শেষ সময়ের দেখা আব্বুর উজ্জ্বল চেহারাটি সারাটি পথ চোখে ভাসছিল। কোথায় যেন শুনেছিলাম: some birds are not meant to be caged, their feathers are just too bright. জেল থেকে বের হয়ে রওয়ানা হলাম সাঁথিয়ার উদ্দেশ্যে, জীবিত বাবাকে রেখে চললাম তার দাফনের প্রস্তুতি নিতে। রাসূল (সা:) এর সেই হাদীসটি তখন বারবার মনে পড়ছিল, যখন তোমরা কোন বিপদ মুসিবতে পড়বে তখন স্মরণ কর সবচেয়ে বড় মুসিবতের কথা। সেটা হবে আমাকে হারানোর মুসিবত। (ইবনে মাজাহ)। এই উম্মত রাসূল (সা:) কে হারানোর কষ্ট সহ্য করেছে। এই উম্মত সবই সহ্য করতে পারবে। রাব্বানা আফরিগ আলাইনা সাবরাও ওয়া সাব্বিত আকদামানা ওয়ানসুরনা আলাল কাওমিল কাফিরিন। ( শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মেঝো ছেলের লেখা থেকে)

পরিবারের সাথে শেষ সাক্ষাতের সময় সবাইকে নিয়ে মোনাজাত শেষে মাওলানা নিজামী তার ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেনকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি ফাঁসির মঞ্চে লুঙ্গি পরে না পাঞ্জাবি-পাজামা পরে যাবেন? মোমেন বললেন, পাঞ্জাবি-পাজামা পরে যাবেন। আল্লাহর প্রিয় বান্দা, মর্দে মুজাহিদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করার প্রেরণায় কতটা ব্যাকুল ছিলেন, তা এখান থেকেই স্পষ্ট বুঝা যায়। পরিবারের সদস্যদের বিদায় দিয়ে মহান রবের পানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন মাওলানা নিজামী। জল্লাদরা যখন তার কক্ষের সামনে যায়, তিনি বললেন, ‘আমি প্রস্তুত’। কখন ফাঁসি কার্যকর হবে? এখানেই শেষ নয়, ফাঁসির মঞ্চে ওঠে ফাঁসি কার্যকরের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর একত্বের ও রিসালাতে মুহাম্মদীর সাক্ষ্য “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” উচ্চস্বরে উচ্চারণ শেষ হলে সর্বশেষ মাবুদের দরবারে তাঁর আকুতি ছিলো, “হে আল্লাহ আমাকে শহীদ হিসেবে কবুল করে নিন”। 

একজন মর্দে মুজাহিদ ও ইসলামের বীর সিপাহসালার হিসেবে নিজের অনুসৃত আদর্শ ও জীবন-কর্ম সম্পর্কে কতটা দৃঢ় আস্থা ও নিঃসংশয় থাকলে ফাঁসির মঞ্চ থেকে মাত্র কয়েক গজ দুরে দাঁড়িয়ে এভাবে পরিবারের সদস্যদেরকে প্রয়োজনীয় গাইড লাইন দেয়া যায় এবং নিজের অভীষ্ট লক্ষ্যে অর্থাৎ জান্নাতের পথে অত্যন্ত ধীরস্থীর শান্ত মেজাজে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। এ যেন মহান আল্লাহ তা’য়ালা আল-কুরআনে জান্নাতি মানুষের যে নমুনা উপস্থাপনা করেছেন, তারই বাস্তব প্রতিচ্ছবি। নিঃসন্দেহে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মহান আল্লাহ তা’য়ালা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে শহীদি মর্যাদা দিয়ে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। মহান আল্লাহ তা’য়ালার বাণী হলো- “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না বরং তার জীবিত। কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো না।” (বাকারা- ১৫৪)
আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা, “এরা তাদের মুখের ফুঁ দিয়ে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়। অথচ আল্লাহর ফয়সালা হলো তিনি তার নূরকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন। কাফেররা তা যতই অপছন্দ করুক না কেন।” (সফ- ৮) তাই মাওলানা নিজামীকে হত্যা করে এদেশ থেকে তাঁর আদর্শকে নিঃশেষ করা যাবে না। শহীদদের শাহাদাতের সাক্ষ্যকে বহন করে এগিয়ে নিয়ে চলবে শহীদের সাথীরা। দেশবাসীকে সাথে নিয়ে এদেশে ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কাজকে আরো বেগবান করার মধ্য দিয়ে শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর প্রতিটি ফোঁটা রক্তের বদলা নিবে,ইনশাআল্লাহ। 

হে! আরশের মালিক মহান পরওয়ারদেগার তোমার গোলামকে তুমি শাহাদাতের সর্বচ্ছ মর্যাদা দিয়ে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল কর। তাঁর রেখে যাওয়া অমাপ্ত আমাদেও কে আন্জাম দেয়ার তৌওফিক দাও। শহীদেও রক্তের বিনিময়ে এ জমিনে দ্বীনের পতাকা উড্ডীন করে দাও,আমীন।