ভাষা আন্দোলনের অবিস্মরণীয় সৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযম

12:00:00

5010 বার পঠিত


ভাষা আন্দোলনের অবিস্মরণীয় সৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযম

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমঃ

২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আজ থেকে ৬৬ বছর আগে বাংলার দামাল ছেলেরা আমার মায়ের ভাষার সম্মান মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন দিয়ে ছিনিয়ে এনেছে বাংলা ভাষা। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি এখন বিশ্বের ১৯০টি দেশে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের ৩০ কোটিরও বেশি লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। এ বিশাল অর্জন একান্ত-ই আমাদের। এই বিরল সম্মানের সেনানায়ক ভাষা সৈনিকরা। তাদের রক্তের লাল কাপড়ে মোড়ানো একুশ-ই ফেব্রুয়ারি। তাদের আন্দোলন সংগ্রামের নিরন্তন লড়াইয়ে পাওয়া আমার মায়ের ভাষা বাংলা। ত্যাগের রক্তিম শিখরে লেখা আমাদের গৌরবোজ্জল দিশা ৫২। জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত্তিতো সেই ভাষা আন্দোলনই। সেই সাহস থেকেই প্রজ্জলিত স্বাধীনতার বিজয় ও স্বাধীন বাংলাদেশ। জাতির সেই শ্রেষ্ঠ সন্তান, বীর সেনানী শহীদদের প্রতি আমাদের বিন¤্র শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও রক্তিম সালাম। কিন্তু যাদের ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এই মুখের ভাষা, সেই সব ভাষা শহীদরা আজ অনেকেই উপেক্ষিত ও বঞ্চিত। আসলে আমরা কি পেরেছি ভাষা সৈনিকদের যথাযোগ্য মর্যাদা ও সম্মানে ভূষিত করতে? 

ভাষা আন্দোলনের লড়াইয়ে প্রথম কাতারের-ই একজন মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর ঐতিহাসিক অমর কীর্তি ও অবদান। দেশে, জাতি আজকের এই দিনে তাঁর ঐতিহাসিক অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে। আগামী দিনের নতুন প্রজন্ম দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও বাক স্বাধীনতার অধিকার আদায়ে ভাষা সৈনিকদের আন্দোলন সংগ্রাম থেকে প্রেরণা লাভ করবে। কোন কালো কালিমা তাদের সোনালি অক্ষরে লেখা এ অবদানকে ম্লান করতে পারবে না। 

অধ্যাপক গোলাম আযম একটি জাগরণ, একটি বলিষ্ঠ নেতৃত্বের নাম। একটি চেতনা ও বিশ্বাসের গগনজোয়ারী কণ্ঠস্বর। মেধা ও নৈতিকতার সমন্বয়ের একটি সম্ভাবনাময় দেশ গড়ার চেতনার অগ্রপথিক। অধ্যাপক গোলাম আযম একজন সৎ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, খ্যাতিমান অহিংস রাজনৈতিক নেতা। যিনি আন্তর্জাতিকভাবে শ্রদ্ধেয় পন্ডিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তিনি ছিলেন মুসলিম উম্মাহর একজন অভিভাবক। তথাকথিত যুদ্ধাপরাধী বিচারের নামে ৯০ বছর বয়স্ক এ প্রবীণ রাজনীতিবিদকে আমৃত্যু সাজা প্রদান করে আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে দেশে-বিদেশে। ২০১৪ সালের ২৩শে অক্টোবর রাত ১০টা ১০ মিনিটে ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালার পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে কারাগারে-ই ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

অধ্যাপক গোলাম আযমের ইন্তেকালের খবর প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বেশ ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। এসব খবরে তাঁকে জামায়াতে ইসলামীর আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে অভিহিত করা হয়। 
গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, ‘তার বিচার ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত।’ আরব নিউজে বলা হয়েছে, ‘১৯৯০ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর তিনি ‘কিং মেকারের ভূমিকা’ পালন করে বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছিলেন। তবুও তাঁর ইন্তেকালে বিএনপি একটি শোকবাণীও দেয়নি।’ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ‘সমালোচকেরা বলে থাকেন যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জামায়াতকে লক্ষ্য করে এবং বিরোধী দলকে দুর্বল করতে ট্রাইব্যুনালকে ব্যবহার করছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানদন্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে”।

অধ্যাপক গোলাম আযমের জানাযায় লক্ষ-লক্ষ মানুষের উপস্থিতি, দেশে-বিদেশে অসংখ্য গায়েবানা জানাযা তাঁর ভক্ত-অনুরক্তদের আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ সব মিলে এক শক্তিশালী গোলাম আযম আবির্ভূত হয়েছে। মনে হচ্ছে এটি তাঁর বিদায় নয়, পূণর্জন্মা এক গোলাম আযম। এই গোলাম আযম বেঁচে থাকবে মানুষের মাঝে অনন্তকাল। পৃথিবী যতদিন থাকবে আল্লাহর দ্বীনের সৈনিকেরা তাঁর জন্য দোয়া করতে থাকবে। তাহাজ্জুতে জায়নামাজ ভাসিয়ে আর বায়তুল্লাহর গেলাপ ধরে অনেকেই কাঁদছে তাঁর জন্য। রাষ্ট্রীয় যাতাকলে পিষ্ঠ, দীর্ঘ কারাবরণ এর মধ্য দিয়ে দেশে-বিদেশে তিনি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। ভাষার জন্য আত্মত্যাগ স্বীকার করেও ভাষার মাসে তিনি থেকেছেন বন্দী, যা জাতির জন্য লজ্জাজনক। বৃদ্ধবয়সে একাকী নিভৃতে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ ছিলেন তিনি। জীবনের শেষ সময়গুলো এ জাতি তাঁর শেষ উপদেশ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, বঞ্চিত হয়েছে তাঁর পরিবার , তরুন সমাজ এবং তাঁর ভক্তরা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “যে অন্যায়ভাবে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করলো, সে যেন গোটা মানব জাতিকে হত্যা করলো।” রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “বিচারক তিন ধরনের দুই ধরনের জাহান্নামী এক ধরনের জান্নাতী, যে সত্য জেনেও অন্যায় বিচারকার্য করে সে জাহান্নামী, যার বিচারকার্যের জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও বিচারকার্য করল সে জাহান্নামী, আর যে সত্যকে জানলো এবং সে অনুযায়ী বিচারে রায় দিল সে জান্নাতি” (ইবনে মাজাহ)। 

এই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন ভাষাসৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযম। স্ব-মহিমায় উদ্ভাসিত একজন মানুষ। নিজ যোগ্যতা বলে তাঁর ঐতিহাসিক সাক্ষর তিনি নিজেই। তিনিই তার উপমা। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে খ্যাত ডাকসু’র সাবেক জিএস। সময়ের সাড়াজাগানো ছাত্রনেতা ছিলেন গোলাম আযম। বর্তমান সময়ের আন্দোলন সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু, বিশ্বব্যাপি সমাদৃত, কেয়ারটেকার সরকারের রূপকার। তিনি ছিলেন বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম অভিভাবক। মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম আজ একটি ইতিহাস, একটি আন্দোলন, একটি চেতনা আর বিশ্বাসের স্মৃতির মিনার হয়ে আমাদের মাঝে দন্ডায়মান। যিনি ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে শ্রদ্ধেয় পন্ডিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। 

এই মেধাবী চৌকস ও অভাবনীয় নেতৃত্বের গুণাবলীসম্পন্ন ক্ষণজন্মা মানুষ ১৯২২ সালে ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট ঢাকা থেকে পাস করেন তিনি। স্কুল-কলেজের গন্ডি পেরিয়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সম্পৃক্ত হন ছাত্র আন্দোলনের সাথে। ১৯৪৭-৪৮ ও ৪৮-৪৯ সালে পরপর দু’বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর জিএস (জেনারেল সেক্রেটারি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

’৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়ে পাকিস্তান সরকার দ্বারা কারা নির্যাতিত হন। এই মহান নেতা ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। শেখ মুজিব কর্তৃক ’৬৬ সালের ছয় দফা দাবি তৈরিতে অংশ নেয়া ২১ সদস্যের অন্যতম। ১৯৫৪ সালে যোগদান করেন জামায়াতে ইসলামীতে এবং প্রত্যক্ষভাবে শুরু করেন রাজনৈতিক জীবন। পাকিস্তানে ১৯৫৫ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। কপ (COP- Combined Opposition Party), পিডিএম (PDM- Pakistan Democratic Movement), ডাক (DAC- Democratic Action Committee) ইত্যাদি আন্দোলনে জনাব শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য সকল দলের নেতাদের সাথে অংশগ্রহণ করে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক কারণে ১৯৬৪ সালেও তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। 

জাতির জীবনে প্রফেসর গোলাম আযম ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যে সংগ্রাম শুরু হয়, তার সাথে তিনি প্রথম থেকেই প্রত্যক্ষভাবে ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে তাকে হাজতবাসসহ শত সহ¯্র নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে এই সাহসী বীরপুরুষ প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনে শরিক হন। এই দিন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হরতাল পালিত হয়। হরতাল সফল করতে অধ্যাপক গোলাম আযম ডাকসুর জিএস হিসেবে ছাত্রদের সংগঠিত করেন। হরতালে পিকেটিংয়ের সময় তাকেসহ ১০-১২ জনকে তেজগাঁও থানা পুলিশ গ্রেফতার করে। 

অধ্যাপক গোলাম আযম এক সাক্ষাৎকারে  বলেছেন- “১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকায় আসেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম মাঠে ছাত্রদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। তাকে ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি সংবলিত একটি ঐতিহাসিক স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। ডাকসু’র জিএস হিসাবে আমার ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার কথাটি ছিল শেষের দিকে। এ প্যারাটি পড়ার সময় ছাত্র-ছাত্রীরা তুমুল করতালি দেয়। করতালি শেষে আমার কানে এলো লিয়াকত আলী খানের স্ত্রী রানা লিয়াকত তার স্বামীকে বলছেন, ‘ল্যাঙ্গুয়েজকে বারে মে সাফ বাতা দেনা।” 

আমি লিয়াকত আলী খান এবং রানা লিয়াকত আলী খানের খুব কাছে বসেছিলাম। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম বিষয়টিকে খুব ভালোভাবে নেননি তিনি। আমি মনে মনে স্থির করলাম বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে কোন মন্তব্য তিনি তার বক্তব্যে করলে আমি সাথে সাথে প্রতিবাদ করে স্লোগান দেব। কিন্তু তিনি খুব ঝানু রাজনীতিবিদ হিসেবে উপস্থিতির মনোভাব উপলব্ধি করে বিষয়টি চেপে গেলেন। 

১৯৫২ সালে পল্টন ময়দানের এক জনসভায় খাজা নাজিমুদ্দিন ছাত্রদের সাথে করা সাত দফা চুক্তির তোয়াক্কা না করে ঘোষণা করলেন বাংলা নয় উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তিনি রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কায়েদে আযমের বক্তব্যেরও পুনরাবৃত্তি করার পরই শুরু হয় প্রতিবাদ বিক্ষোভ। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি”

১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার অন্যায়ভাবে তার জন্মগত নাগরিকত্ব অধিকার হরণ করলেও পরবর্তীতে, ১৯৯৪ সালে, সুপ্রিম কোর্টের সর্বসম্মত রায়ে নাগরিক অধিকার ফিরে পান এবং তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। কিন্তু সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে আওয়ামী লীগ এই বর্ষীয়ান জাতীয় রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধী বিচারের নামে প্রহসন চালিয়ে তাঁর উপর ইতিহাসের ঘৃণ্য নির্যাতন চালিয়ে তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।

পদ-পদবি ও ক্ষমতার প্রতি নির্লোভ একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ছিলেন অধ্যাপক গোলাম আযম। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি একজন নেতা, যিনি ত্রিশ বছর জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে থেকে সর্বশেষ স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণকারী এবং উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক স্মরণীয় ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত। এ প্রবীণ মজলুম জননেতা ও বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, যিনি ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে মানবজীবনের যাবতীয় সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামে নিবেদিত প্রাণপুরুষ।

জীবন সন্ধিক্ষণের শেষ অবধি এ সংগ্রামী নেতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আর অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন। ষড়যন্ত্রকারীরা মিথ্যার কালো পর্দার আড়ালে তার স্বর্ণোজ্জ্বল অনেক অবদানকে ঢেকে রাখার অপপ্রয়াস চালিয়েছিল নিরন্তনভাবে। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন প্রথম কাতারে। অধ্যাপক গোলাম আযম বলেন, ফেব্রুয়ারি ১৯৯১-এর নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জন্য আওয়ামী লীগ জামায়াতের সহযোগিতা প্রার্থনা করে আমার নিকট ধরনা দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতা আমির হোসেন আমু সাহেব জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদ সাহেবের মাধ্যমে আমাকে মন্ত্রী বানাবার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। তখনও তো আওয়ামী লীগের মনে হয়নি যে, জামায়াতে ইসলামী যুদ্ধাপরাধী! পরবর্তীতে, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী জামায়াতের সমর্থন লাভের আবদার নিয়ে যখন আমার সাথে সাক্ষাৎ করেন, তখনও তো তাদের দৃষ্টিতে জামায়াত নেতৃবৃন্দ ‘যুদ্ধাপরাধী’ ছিল না!

মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম কখনো এমপি, মন্ত্রী কিছুই হননি সুযোগ থাকার পরও। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভিনব এবং নির্যাতিত ব্যক্তি ছিলেন অধ্যাপক গোলাম আযম। ব্যক্তিগত খুঁটিনাটি, চাওয়া-পাওয়া বৃহত্তর স্বার্থে তাঁর ত্যাগ এমন বহু বাস্তবতা এখন দৃশ্যের অন্তরালে। যিনি ক্ষমতায় না থেকেও ক্ষমতাসীন সকলের অপবাদের দায়ভার কাঁধে পড়েছে। যিনি দেশ, জাতি ও মানবতার কল্যাণে সব সময় ভূমিকা রেখেছেন কিন্তু তার বিনিময়ে সব সরকার থেকে উপহার পেয়েছেন কারাবরণ! 

বিশ্বজুড়ে তার অসম্ভব খ্যাতি, তাকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৌতূহলের শেষ নেই এখনো। সব সময়ই ঐতিহাসিক সত্য বর্তমান অবস্থায় উপনীত হওয়ার ক্ষেত্র। তার আত্মনির্মাণ এবং বিকাশের ক্ষেত্রে বেশকিছু চিন্তা হিসেব নিকেশ ছিল সুদুর প্রসারী। বিশেষ করে ভারতের আগ্রাসন ও অধিপত্যবাদের ক্ষেত্রে অধ্যাপক গোলাম আযমের ৪৭ বছর পূর্বের ভাবনা আজকের সবচেয়ে সত্য ও বাস্তবতা। এখন আমাদের নতুন প্রজন্মকে ভাবিয়ে তুলছে। 

অধ্যাপক গোলাম আযমের দেয়া কেয়ারটেকার ফর্মূলা দেশে-বিদেশে সমাদৃত ও প্রশংসিত। ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠ্য বইয়ের অন্তর্ভূক্ত। রাজনৈতিক চেতনায় খুবই সংকীর্ণ শেখ হাসিনার পক্ষে এমন গোলাম আযমকে মানা খুবই অসম্ভব। তাঁর উদ্ভাবন, চিন্তা, আবিষ্কার তাকে টিকিয়ে রাখবে শতাব্দী থেকে শতাব্দী। আওয়ামী লীগ ব্যক্তি গোলাম আযমকে হত্যা করে তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শকে স্তব্ধ করতে পারবে না। সমকালীন ও আন্তর্জাতিক ঘটনা প্রবাহে তাঁর অনেক কর্মই আজ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত।

মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম এর প্রজ্ঞা, লেখনি, চিন্তা, রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি, ক্ষমা; মহানুভবতা, নিয়মানুবর্তিতা, ধৈর্য্য এবং সহনশীলতার মতো যাবতীয় মহৎ গুণাবলি কালোত্তীর্ণ। নির্যাতিত-নিপীড়িত, নিস্পেষিত জনতার অধিকার এবং মর্যাদাবোধ সম্পর্কে এক আবহ তৈরি করতে সাহায্য করেছে। একবিংশ শতাব্দীর উষালগ্নে মানবাধিকার, গণতন্ত্র, ইসলাম, জাতিগত অধিকার এবং সচেতনতা, পারস্পরিক মর্যাদাবোধ নিয়ে বিশ্ব যখন চরম সঙ্কটের মোকাবিলা করছে, ঠিক তেমনি একটি মুহূর্তে নিজের কর্ম মহানুভবতার মাধ্যমে স্ব-মহিমায় নিজেকে এমনই এক প্রতীকে রূপায়িত ভাষা সৈনিক মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম। তা নিকট অতীতে খুবই বিরল।

বাংলার বুকে লক্ষ-কোটি তরুন এখন ইসলামের পতাকাতলে সমবেত। পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল শহীদ বীরদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে দ্বীন কায়েমের চেতনায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যারা জীবন দিতে জানে কিন্তু মাথা নত করেনা এক আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে। যারা চিরদিন গোলাম আযমকে মনে রাখবে, চিরদিন ভালবাসবে, সম্মান করতে থাকবে নিজের গরজে। তার লেখনী ইসলামের পথে উজ্জীবিত করবে শতাব্দীর পর শতাব্দী। অনাগত যুবকদের জন্য তিনি হয়ে থাকবেন নতুন পথের দিশা এবং ঘটতে থাকবে নব দিগন্তের উত্থান। ভাষা সৈনিক মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম শ্রদ্ধা পেতে রাষ্ট্রের কোন আইনের প্রয়োজন পড়বে না। অধ্যাপক গোলাম আযমের সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে বাংলাদেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন সময় তার সহযোগীতা ও পরামর্শ নিয়েছে। তাঁর আবিস্কৃত কেয়ারটেকার সরকার আদায়ের আন্দোলনে সময়ের ব্যাবধানে সব রাজনৈতিক দলগুলো একই আওয়াজ তুলেছে। 

অধ্যাপক গোলাম আযমের জানাযা ছিল “টক অব দ্যা ক্যান্ট্রি” জাতীয় নেতাদের মধ্যে তাঁর জানাজায় নিকট অতীতে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের সমাগম হয়েছে!! “অধ্যাপক গোলাম আযমের চতুর্থ ছেলে সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আল আযমী পিতার জানাজায় ইমামতি করেন। জানাজার আগে উপস্থিত লাখো মানুষের উদ্দেশে তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। এ সময় সেখানে আবেগঘন এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন তখন। আমান আযমী বলেন, আমার পিতাকে মিথ্যা মামলায় এক হাজার ১৬ দিন তালাবন্দি করে রাখা হয়েছে। এর প্রতিটি দিন আমার পিতার জন্য, আমার পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের জন্য ছিল বেদনার। আমার পিতা সারা জীবন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করে গেছেন। এটাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। আপনারা অধ্যাপক গোলাম আযমকে ভালোবাসেন না। আপনারা ভালোবাসেন দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য একনিষ্ঠভাবে নিবেদিত একজন কর্মী গোলাম আযমকে। তাঁর বিদায় মানে ইসলামী আন্দোলনের বিদায় নয়। এদেশে আরও লাখো লাখো গোলাম আযম তৈরি হবে ইনশাআল্লাহ, যারা একদিন এদেশের মাটিতে ইসলামের বিজয় পতাকা উড়াবে, ইসলামকে বিজয়ী করবে।”

কিন্তু দূভার্গজনক হলেও সত্য অধ্যাপক গোলাম আযমের সুযোগ্য সন্তান, সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আল আযমি এখনো নিখোঁজ! রাষ্ট্রের একজন প্রথম শ্রেণির নাগরিক হওয়ার পরও তিনি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত! যেখানে রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা সেখানে রাষ্ট্রই যেন অধিকার হরণ করছে! শুধু কি অধ্যাপক গোলাম আযমের সন্তান হওয়াই এই সাবেক চৌকস সেনা কর্মকর্তার একমাত্র অপরাধ! 

হে! আরশের মালিক তুমি আমাদের শ্রদ্ধেয় প্রিয় নেতা ভাষা সৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযমকে জান্নাতুল ফেরদাউসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন। আমীন।।