রক্তাক্ত ২৮ ফেব্রুয়ারি: নির্বিচার গণহত্যার দিন

12:00:00

217 বার পঠিত


রক্তাক্ত ২৮ ফেব্রুয়ারি: নির্বিচার গণহত্যার দিন


ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম: Genocide--কোনো বিশেষ ধর্মমত, রাজনৈতিক মতবাদ বা কৃষ্টিসম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে নির্মূল বা হীনবল করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত সুপরিকল্পিত ও ব্যাপক গণহত্যা। Encyclopedia of Britannica তে বলা হয়েছে- Genocide, Deliberate and systematic destruction of a racial, religious, political or ethnic group. It’s ÒCrimes against humanity'' দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হিটলার এরূপ গণহত্যার মাধ্যমে ইহুদী জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলো। যুগে-যুগে এভাবে উগ্র প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে সন্ত্রাসবাদী একনায়কতন্ত্রী ফ্যাসিবাদ। মূলত: শাসকগোষ্ঠী যখন গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সামাল দিতে ব্যার্থ হয় তখন-ই এই পথের আশ্রয় নিয়ে থাকে। ফ্যাসিবাদের দুই প্রধান মহনায়ক ছিলো ইতালির বেনিটো মুসোলিনি এবং জার্মানির এডলফ হিটলার। মুলত শোষিত, মজলুম আর নির্যাতিত শ্রেণীর আন্দোলন ও শক্তিকে দমানোর জন্যই এর উদ্ভব হয়। এই কাজে তারা প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে।

১৯২২ সালে ইতালিতে আর ১৯৩৩ সালে জার্মানীতে ফ্যাসিবাদের গোড়াপত্তন হলেও আজকের বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন শাসক শেখ হাসিনার সরকারের চরিত্রের সাথে অমিল পাওয়া খুবই দুষ্কর। বিগত চার বছর এই জালিম সরকার বিরোধী দল ও সাধারণ জগগণের উপর হত্যা, দমন নিপিড়ন চালিয়েছে। সম্প্রতি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ে বিক্ষোভে জ্বলে ওঠে সারাদেশ। জামায়াত বলছে- “তাদের আন্দোলন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে নয়, তারা নিরাপরাধ জামায়াত নেতাদের যুদ্ধাপরাধী সাজানোর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে” তাই সাঈদীর ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ রূপ নেয় গণআন্দোলনে।

বলা যায় স্বাধীনতা পরবর্তী এমন গণআন্দোলন এদেশের মানুষ আর প্রত্যক্ষ করেনি। একজন মানুষের প্রতি জনগনের শ্রদ্ধা আর ভালবাসার গভীরতাও এখান থেকে উপলদ্ধি করা যায়। রাজধানীর ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সারাদেশ। কার্যত অচল হয়ে পড়ে সরকার। শাহবাগীদের ফাঁসি ফাঁসি খেলার বিপরীতে এই ছিল জনগণের পক্ষ থেকে এক প্রচন্ড ক্ষোভের বহি:প্রকাশ। সরকারের প্রত্যক্ষ নির্দেশে মাত্র কয়েক সপ্তাহে দু’শতাধিক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা দেশ ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় খুব ঘটা করেই প্রচার করা হয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে গণহত্যার অভিযোগ। এখন প্রশ্ন উঠেছে এই নি:সৃংশ হত্যাযজ্ঞের দায় কার? এই নিয়ে চলছে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। শুরু হয় ১৮ দলের এক দফার আন্দোলন। এতে উত্তপ্ত হয়ে উঠে রাজনৈতিক অঙ্গন। 
মানুষের মৃত্যু নিয়ে সরকার করছে তামাশা আর প্রচন্ড মিথ্যাচার। এমন নির্মম উপহাস পৃথিবী হয়ত এর আগে কখনো কেউ প্রত্যক্ষ করেনি! কারণ এই গণহত্যায় যারা নিহত হয়েছেন তারা কোন দল বা মতের তার থেকে বড় প্রশ্ন হচ্ছে তারা মানুষ কিনা! আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কত নিম্ন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই হত্যাকান্ডের দায় নিয়ে সংসদ এবং এর বাহিরে অনেক বক্তব্য রেখেছেন, কিন্তু একবারের জন্যও দু:খ প্রকাশ করেননি। ক্ষতিপুরণ তো দুরের কথা তাদের বিদেহী আত্না ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য কিছুই বলেননি। বরং উল্টো অসংখ্য পরিবারকে মামলা দিয়ে বাড়ি ছাড়া করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনা তিনিতো শুধু আওয়ামী লীগের সভনেত্রীই নন তিনি দেশের ১৬ কোটি মানুষের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আপনি কি দেখেননি নিহত স্বজনদের আহাজারি আল্লাহর আরশকে কাঁপিয়ে তুলেছে। কিন্তু এই সত্য মজলুমের হাত আর আল্লাহর আরশের মাঝে কোন দেয়াল নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি নিশ্চয়ই জানেন, নিহত মানুষগুলোর মধ্যে অনেক নির্দলীয় জনসাধারণ, নারী ও শিশুও রয়েছে। হায়! আফসোস! আমাদের নুন্যতম মানবিক বোধটি আজ হীনরাজনৈতিক কারণে একবারে-ই ভোতা হয়ে গেছে তার জন্য। আমাদের এই বিভক্তি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে গোবিন্দলে নিহত ও আহতদের পরিবারকে সমবেদনা জানাতেই মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার চারিগ্রাম ও গোবিন্দলে দুইটি জনসভায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন- “বর্তমান সরকার ‘খুনি, রক্তপিপাসু ও বিধর্মী’ খুনি সরকারের সঙ্গে কথা বলে কোনো লাভ নেই। বিদায় তাদের নিতেই হবে। হয়তো আরও কিছু প্রাণ যাবে। আওয়ামী লীগ মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডায় হামলা করার অভিযোগ করে তিনি বলেন, যখন জনগণ ধর্মদ্রোহী শাহবাগিদের প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন দৃষ্টি ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ করছে। উপাসনালয়ে হামলাকারী সরকার কোনো ধর্মই মানে না। জনগণ সরকারের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে; বিদেশিরাও আস্থা হারিয়েছে। এখন কেবল প্রতিবেশীদের ওপর ভর করে টিকে আছে তারা। বিদেশিরা জনগণের পক্ষে থাকলে এ সরকারকে আর সমর্থন দেবে না।

মহাজোট সরকার পদ্মা সেতু করতে পারবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার অর্থায়নের নামে সরকার নতুন ভাঁওতাবাজি করছে। আওয়ামী লীগকে মানুষ মারার ওস্তাদ অভিধা দিয়ে ভবিষ্যতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হুকুমের আসামি করে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ও পিলখানা হত্যার বিচার করা হবে।” (আমার-দেশ- ১৭-০৩-১৩) 
আওয়ামী লীগ কি একথা বিশ্বাস করেনা, যে বর্তমান আধুনিক সভ্য পৃথিবীতে মানবাধিকার এখন মানুষের জীবনের অখন্ডিত চেতনা বা বিশ্বাস। আন্তর্জাতিক আইনের অংশ হওয়ায় বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার একটি আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে মনে করতো মানবাধিকার কেবল কোন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। তাই কোন রাষ্ট্রের নাগরিকের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে অপর কোন রাষ্ট্রীয় কতৃপক্ষ তা নিয়ে মাথা ঘামাতো না। আজকে এমনটি ভাববার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ কে আলোড়িত না করলেও সকল রাষ্ট্রের মানুষই ব্যাথা অনুভব করছে বাংলাদেশ নিয়ে। আর এই মনোভাব থেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে জাতিসংঘের মানবাধিকারের সার্বজনীন সনদ। বাংলাদেশও এর স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে যুদ্ধপরাধ ইস্যু আমাদের অভ্যন্তরীণ বলে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের যেন কোন তোয়াক্কাই সরকার করছে না।

বরং মানবাধিকারের সংরক্ষণ অথবা লঙ্ঘন যেন সরকারের নিজস্ব মর্জির ব্যাপার হয়ে গেছে। এ যেন- “আমার মুরগী আমি যেভাবে ইচ্ছা জবাই করব কার কি বলার আছে”। এ গোঁয়ার্তুমী ধরতে গিয়ে পৃথিবীর বড় বড় ক্ষমতাধর শাসকরা কাবু হয়ে গিয়েছে জনগণের প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের মুখে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

পৃথিবীর যত জায়গায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, প্রায় তার সবটিই রহ in the name of law তথা আইনের দোহাই দিয়েই হয়েছে। বর্তমান সরকারও আইনের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ও আদালতকে ব্যবহার করে সেই অন্যায়টি-ই করছে বে-আইনীভাবে। Legal Right আইনগত অধিকার হলো সেই স্বার্থ যা আইনের নীতিসমূহ দ্বারা স্বীকৃত ও সংরক্ষিত। যেমন কথা বলার আধিকার, চলা-ফেরার অধিকার, যার মধ্যে মানুষের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও ধর্মীয় অধিকার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ প্রসঙ্গে মনীষী Gettel বলেছেন- In a state of nature