শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা একটি প্রেরণা

12:00:00

1546 বার পঠিত


শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা একটি প্রেরণা

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম 

খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০ সালে গ্রিসের এথেন্সে জন্মগ্রহণ করেছিলেন দার্শনিক সক্রেটিস। তরুনদের ভুলপথে চালিত করা, ধর্মের অপব্যাখ্যা এবং দুর্নীতিকে প্রশয় দেওয়ার মতো অভিযোগ আনা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে। হ্যামলক বিষ প্রয়োগে হত্যার রায় দিয়েছিল আদালত। ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের পরেও অপরাধী প্রকৃত দোষী কি না, তা নিয়ে তর্ক চলতেই থাকে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার প্রায় ২৪১৫ বছর পরে কেউ যদি নির্দোষ প্রমাণিত হন? চমকে উঠছেন তো? মৃত্যুদণ্ডের ২৪১৫ বছর পরে গ্রিসের একটি আদালত জানালো, সক্রেটিস নির্দোষ ছিলেন। হেমলক বিষপান করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ মাথা পেতে নিয়েছিলেন সক্রেটিস। এই মামলার বিচারের জন্য আমেরিকা ও ইউরোপীয় বিচারকদের সমন্বয়ে একটি প্যানেল তৈরি করা হয়। দীর্ঘ বাদানুবাদের পরে সক্রেটিসের আইনজীবীর যুক্তিতেই সিলমোহর দেন বিচারকরা। গত বছর নিউইয়র্কের একটি আদালতেও সক্রেটিস নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছিলেন। (সূত্র: বিডি প্রতিদিন)

বিচার-ইতিহাসে এ ধরনের রায়ের অসংখ্য নজির রয়েছে, যার ভিত্তিতে কথিত অভিযুক্ত ব্যক্তি হত্যার পর প্রমাণিত হয়েছে, আদালতের দেয়া রায়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত ছিল না। জামায়াত নেতা জনাব আবদুল কাদের মোল্লার বিষয়েও হয়তো ভবিষ্যতে এমনটি বলা হতে পারে, যে রায়ের ভিত্তিতে তাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে তা সঠিক ছিল না। তাছাড়া বিচারের সাথে সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে দেশের জনগণ ইতোমধ্যে জানাতে শুরু করছে। সত্যকে কখনো ঢেকে রাখা যায়না।

১২ ডিসেম্বর ২০১৩ সাল ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়। এই দিনটি ইতিহাসে একটি কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই দিনে বিশ্বের ইতিহাসে একজন নিরীহ, নিরপরাধ মানুষকে রাষ্ট্রীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ইতিহাস হয়তো একদিন প্রমাণ করবে এটি ছিল একটি রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড।

পৃথিবীর সব নীতি-নৈতিকতা, মানবাধিকার, সব উপেক্ষা করে যাকে হত্যা করা হয়েছে তিনি একাধারে একজন রাজনীতিবিদ, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, লেখক, ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও সদালাপী প্রাণপুরুষ। তিনিই রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সেদিন শুধু একজন আবদুল কাদের মোল্লাকেই হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছে মানবাধিকার, সত্যপন্থা, কল্যাণ, সুন্দর আর ন্যায়ের প্রতীক আবদুল কাদের মোল্লাকে। যিনি নিজেই তার দীর্ঘ সাফল্যম-িত কর্মের প্রতিক। তিনি ২ ডিসেম্বর ১৯৪৮ সালে ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার জরিপারডাঈী গ্রামে পিতা মো: সানাউল্লাহ মোল্লা এবং মাতা বাহেরুন্নেসা বেগমের ঘরকে আলোকিত করে এই পৃথিবীতে আগমন করেন।

মেধাবী আবদুল কাদের মোল্লা শিক্ষাজীবন শুরু করেন ১৯৫৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষাবৃত্তি লাভ করার মধ্য দিয়ে, আর প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৭৭ সালে শিক্ষা প্রশাসন থেকে মাস্টার্স ডিগ্রিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। সেই পথ ধরে কর্মজীবনের পরতে পরতে রাখেন সাফল্যের স্বাক্ষর।

লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় পারদর্শী আবদুল কাদের মোল্লা ১৯৮১ সালে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, পরপর দুই বছর ঢাকা ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট (ডিইউজে)-এর সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনিই তার কর্মময় জীবনের সাক্ষী। তার পরিচয় তিনি নিজেই। চলনে-বলনে, সহজ-সরল আর সাদাসিধে, বুদ্ধি-বাগ্মিতায় অসাধারণ, কর্মপ্রাণ চঞ্চলতায় যেন সর্বত্র বিরাজমান, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও নিরহঙ্কার, পরোপকারী এবং সজ্জনব্যক্তি হিসেবে সবার কাছে পরিচিত।

যিনি একবার তার সাহচর্য পেয়েছেন তিনি তাকে ভুলতে পারছেন না। কারাগারে অসংখ্য ভক্ত-অনুরক্ত থেকে তার আচার-ব্যবহারের প্রশংসা শুনেছি। দ্বীনের দায়ী হিসেবে পৃথিবীর অনেক প্রান্তে। মিথ্যা কালিমা আর ষড়যন্ত্রের কালো কাপড় কি সেই আলোকচ্ছটাকে আবৃত করতে পারে? যেই শির আজন্ম এক পরওয়ারদিগার ছাড়া কারও কাছে নত হয়নি, ফাঁসির আদেশে সেই শির কি দুনিয়ার কোনো শক্তির কাছে নতি স্বীকার করতে পারে?

শাহাদাতের পূর্বে আল্লাহর দ্বীনের মুজাহিদের জবানীতে এমন সাহসী উচ্চারণ উদ্দীপ্ত করেছে সারা বিশ্ববাসীকে। তিনি বলেছেন, ”বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামী আন্দোলনের জন্য আমি আমার জীবন উৎসর্গ করেছি। আমি অন্যায়ের কাছে কখনও মাথা নত করিনি, করবও না। দুনিয়ার কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট প্রাণভিক্ষা চাওয়ার প্রশ্নই আসে না। জীবনের মালিক আল্লাহ। কিভাবে আমার মৃত্যু হবে তা আল্লাহই নির্ধারণ করবেন। কোনো ব্যক্তির সিদ্ধান্তে আমার মৃত্যু কার্যকর হবে না। আল্লাহর ফায়সালা অনুযায়ীই আমার মৃত্যুর সময়ও তা কার্যকর হবে। সুতরাং আমি আল্লাহর ফায়সালা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেবো।’

হযরত রাশেদ বিন সা’দ জনৈক সাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন। ‘কোনো এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা)! কবরে সকল মুমিনের পরীক্ষা হবে, কিন্তু শহীদের হবে না, এর কারণ কী? হুজুর (সা) জবাবে বলেন, তার মাথার ওপর তলোয়ার চমকানোই তার পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট।’ জন্ম থেকে শাহাদাত পর্যন্ত জনাব আবদুল কাদের মোল্লা একটা নাম, একটা প্রেরণা, একটা জীবন্ত ইতিহাস।

রাজনীতি সচেতন জনাব আবদুল কাদের মোল্লা অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালেই কমিউনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ছাত্র ইউনিয়ন ছেড়ে তিনি তৎকালীন সময়ে মেধাবী ছাত্রদের সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ পূর্ব পাকিস্তান শাখায় যোগদান করেন। চৌকস নেতৃত্বের অধিকারী জনাব মোল্লা সর্বশেষ জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

আল্লাহর দীনের এই অকুতোভয় সৈনিক বিভিন্ন মেয়াদে চার-চারবার কারাবরণ করেছেন। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন,এরশাদ বিরোধী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনে তাকে আটক করা হয়।

যাকে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধী বানিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তিনি যুদ্ধাপরাধ তো দূরের কথা স্বাধীনতার সপক্ষে একজন যোদ্ধার প্রস্তুতিই নিয়েছেন তিনি বলেন, ‘২৩ মার্চ, ১৯৭১ ওই দিন আমরা বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ পড়ুয়া ছাত্র এবং স্কুলের উচ্চ শ্রেণীর কয়েকজন ছাত্র একত্রিত হই। সবাই প্রশিক্ষণ চালিয়ে যেতে থাকি।’

আবদুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে। কিন্তু রাতের একান্তে নিভৃতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি নিজের বিবেককে প্রশ্ন করে বলুন? আপনারা কি কসাই কাদেরকে হত্যা করেছেন? আমার মনে হয়, উত্তর হবে ‘না’। আপনি জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাকে হত্যা করেছেন। যিনি ছিলেন আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। এক সময় তিনি আপনার রাজনৈতিক মিত্র ছিলেন। এক সময় একান্ত নিভৃতে ডেকে রাজনৈতিক শলা-পরামর্শও করেছেন তার সঙ্গে।

আবদুল কাদের মোল্লা বলেছেন, ‘১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনে জামায়াত এবং বিএনপি আলাদাভাবে নির্বাচন করে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একপর্যায়ে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন এবং আমাকে বললেন, আমরা তো সরকার গঠন করলাম, আমাদের কিছু পরামর্শ দেন। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর মুখ্যসচিব ছিলেন এবং তিনি আমাকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে রিসিভ করেন। আমি তখন প্রধানমন্ত্রীকে কিছু গঠনমূলক পরামর্শ দেই যা শুনে তিনি আমাকে সাধুবাদ দেন। একইভাবে তিনি পরে আমাকে আরও দুইবার ডেকেছিলেন। এখন আমি মনে করছি দীর্ঘদিন যাদের সঙ্গে রাজনৈতিক আন্দোলন করলাম, মিটিং-মিছিল করলাম, সুসম্পর্ক রাখলাম, সখ্য রেখে চলেছি তারা এখন শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য দীর্ঘ ৪০ বছর পর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে।’ সেদিন কি কুখ্যাত, হত্যাকারী কসাই কাদেরকে জাতি চিনত, তাহলে আপনি কি সেই কসাই কাদেরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন?

আজ পৃথিবীবাসীর কাছে বিখ্যাত আর এত জনপ্রিয় ফরিদপুরের অজোপাড়া গ্রামের আবদুল কাদের মোল্লা। তিনি এখন মুসলিম উম্মাহর প্রেরণা। যিনি অর্থবৃত্তে ধনী অথবা দুনিয়ার ক্ষমতাশালী কোনো ব্যক্তিও ছিলেন না। কিন্তু এমন সৌভাগ্য জীবনের অধিকারী। পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ তাদের গায়েবানা জানাজায় অংশগ্রহণ করেছে। কেয়ামত পর্যন্ত কোটি মুসলমান তাঁদের জন্য দোয়া করতে থাকবে। তাহাজ্জুদে চোখের পানিতে জায়নামাজ ভাসাবে। এমন গৌরবের মৃত্যু কতজনের ভাগ্যে জোটে!! আর এদেশের মানুষ অনেক জাতীয় নেতার মৃত্যুও দেখেছে, ভালো করে জানাজা পড়ার লোকও আসেনি। আইন করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকা যায়, স্যালুট আদায় করা যায়, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা যায় না।

কারাগারে মোল্লা ভাইয়ের খেদমত করেছেন তাদের অনুভূতি সত্যিয় বিষ্ময়কর!। কাদের মোল্লার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা অবাক করার মত। তাদের কান্না যেন থামছেনা। আমি কারাগারে তা নিজ চোখে দেখে এসেছি। অসংখ্য হাজতি-কয়েদী নির্বাক হয়ে চোখের পানি ঝরিয়েছে। এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কয়জনের ভাগ্যে জোটে? কিন্তু চোখের পানি কি বৃথা যাবে?

শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের দাবির প্রেক্ষিতে আইন সংশোধন করে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় হওয়ার পর থেকেই জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সংস্থা রায়ের বিষয়ে প্রশ্ন তুলে তা কার্যকর করা থেকে সরকারকে বিরত থাকার আহ্বান জানায়। কারণ বিচার প্রক্রিয়া, সরকার পক্ষের অনুসন্ধান ও তথ্য-প্রমাণ, তদন্ত কর্মকর্তা ও সরকারি আইনজীবীদের আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাছাড়া বার বার আইন সংশোধন করে ফাঁসির উপযোগী করা হয়। যা বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। অপরাধ নয় আওয়ামী লীগ ও শাহবাগীদের দাবিই বিচার্য বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত করা। সাক্ষী নিয়ে সরকার পক্ষের লুকোচুরি খেলাসহ ফাঁসির রায়। সরকার পক্ষের জবরদস্তিমূলক আচরণে বিচারের মানদ- নিয়েও প্রশ্ন ঊঠেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।

আব্দুল কাদের মোল্লা আর কসাই কাদের এক ব্যক্তি নন। এমন বক্তব্য দিয়ে মিডিয়ায় ঝড় তুলেছেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি। তাকে লিখা চিঠিতে আব্দুল কাদের মোল্লা লিখেছেন-

”হাসবে মিরপুরের কসাই কাদের ‘আমি ফরিদপুরের কাদের মোল্লা। সরকার আমাকে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে হত্যা করতে যাচ্ছে। আমার হত্যাকাণ্ডের পর আমি কিয়ামত পর্যন্ত কাঁদতে থাকব। আর হাসবে মিরপুরের কসাই কাদের।’ গোলাম মাওলা রনি তার এ চিঠিটি ফেসবুকে ছেড়ে দেয়ার পর বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায় তা। (সূত্র : দৈনিক আমার দেশ)

আবদুল কাদের মোল্লা ভাইয়ের সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি আজ নাড়া দেয় প্রতিনিয়ত। ২০০৯ সালে আবদুল কাদের মোল্লা ভাই সৌদি সরকারের রয়েল গেস্ট হিসেবে আর আমি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে পবিত্র হজ পালন করতে যাই। মোল্লা ভাইয়ের সঙ্গে মদিনায় সাক্ষাৎ। তার সফর ছিল সংক্ষিপ্ত। তাই মদিনায় একটি কমিউনিটি সেন্টারে একটি মতবিনিময় অনুষ্ঠানে মোল্লা ভাই ছিলেন প্রধান অতিথি আর আমি ছিলাম বিশেষ অতিথি। অনুষ্ঠানে আমি যখন সারাদেশে আমাদের ভাইদের ওপর জুলুম নির্যাতন এবং শহীদ ভাইদের ঘটনা বর্ণনা করছিলাম তখন উপস্থিত সবাই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে। আমি মোল্লা ভাইকে অনেকবার চোখের পানি মুছতে দেখেছি। আলোচনায় তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশে শিবিরের যুবক-তরুনেরা জীবন দিচ্ছে দ্বীনের জন্য। সুতরাং আপনারা শুধু দান-খয়রাত করলে মুক্তি পাবেন না। কারণ আপনারা এমন জায়গায় আছেন যেখানে রাসূল (সা) শুয়ে আছেন। বদর, ওহুদ সব এখানেই। সুতরাং দ্বীনের পথে ত্যাগ কোরবানি ছাড়া আমাদের মুক্তি মিলবে না।’ আজ তিনি নিজেই সারা পৃথিবীর মুসলিম উম্মাহর কাছে একটি প্রেরণা, একটি ইতিহাস, এই দুঃসাহসিক দুর্জয় পথে দুরন্ত সাহস।

শাহাদতের জন্য মোল্লা ভাইয়ের মন কেমন পাগলপারা ছিল এই ঘটনা থেকে তা উপলব্ধি করা যায়। খুব সম্ভব ২০০৯ সালের ২৮ অক্টোবর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়াতনে ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজন করে আলোচনা সভার। অতিথিরা উপস্থিত। আলোচনা সভা শুরু হয়ে গেছে। ঠিক মাঝখানে আমাদের প্রিয় মোল্লা ভাই প্রোগ্রামে এসে হাজির। আমি দাঁড়িয়ে রিসিভ করে বললাম, মোল্লা ভাই আপনি আসছেন এ জন্য মোবারকবাদ। কারণ মোল্লা ভাই আমাদের দাওয়াতি মেহমানের মধ্যে ছিলেন না। তবু তিনি নিজ উদ্যোগে আলোচনা সভায় হাজির হয়েছেন। বলতে না বলতে তিনি বললেন, শুনেছ ২৮ অক্টোবর ২০০৬ প্রোগ্রামে অনুপস্থিতির বেদনা আমাকে সব সময় তাড়িয়ে বেড়ায়। পল্টনে আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি। যেখানে আমাদের ভাইয়েরা শহীদ আর গাজী হয়েছেন।

ওই দিন আমি ঢাকায় ছিলাম কিন্তু আমিরে জামায়াত আমাদের কেন্দ্রীয় অফিস থেকে সব খোঁজখবর রাখতে বললেন। এই জন্য আমি পল্টনে ছিলাম না। সেদিনের এই অনুপস্থিতির বেদনা থেকে তোমাদের দাওয়াত না পেয়েও বে-দাওয়াতে এখানে উপস্থিত হয়ে গেলাম। এই কথাগুলো মোল্লা ভাই স্টেজে বসে বসে বললেন। তখন বুঝতে পারিনি কিন্তু আজ সারা পৃথিবী জানে তিনি কত গভীরভাবে শাহাদাতের চেতনাকে লালন করতেন।

মোল্লা ভাইয়ের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মোল্লা ভাই আল্লাহর দরবারে তার মৃত্যু যেন বৃহস্পতিবারে হয় তার কামনা করতেন। আর তার নামাজে জানাজা যেন তাহাজ্জুদের সময় হয়। আবেদন শুনে আমার কাছে জটিলই মনে হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই প্রিয় বান্দার সেই ফরিয়াদও কবুল করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ। এই সরকার তার ফাঁসি প্রথম দিন ১১ ডিসেম্বর কার্যকর করতে চেয়েছিল কিন্তু তা আদালতের নির্দেশের কারণেই হয়নি। তার ফাঁসি ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবারই হয়েছে।

সত্যিই, জনাব আবদুল কাদের মোল্লাসহ আল্লাহর দ্বীনের মুজাহিদদের ঈমানী দৃঢ়তা দ্বীনের পথিকদের উৎসাহিত করছে। আবদুল কাদের মোল্লা ভাইয়ের মৃত্যু পরোয়ার জারি করার পরও কিন্তু দ্বীনের এই মুজাহিদকে এতটুকু হতাশাও আচ্ছন্ন করতে পারেনি।

শাহাদাতের রাতে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে জনাব আবদুল কাদের মোল্লা তার স্ত্রী, পুত্র, মেয়ের কাছ থেকে এভাবেই শেষ বিদায় নিয়েছিলেন, ‘আমি তোমাদের অভিভাবক ছিলাম। এ সরকার যদি আমাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, তাহলে সেটা হবে আমার শাহাদাতের মৃত্যু। আমার শাহাদাতের পর মহান রাব্বুল আলামীন তোমাদের অভিভাবক হবেন। তিনিই উত্তম অভিভাবক। সুতরাং তোমাদের দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। ইসলামী আন্দোলনকে বিজয়ী করার মাধ্যমে আমার হত্যার প্রতিশোধ নিও। শুধুমাত্র ইসলামী আন্দোলন করার অপরাধেই আমাকে হত্যা করা হচ্ছে। শাহাদাতের মৃত্যু সবার নসিবে হয় না। আল্লাহ তায়ালা যাকে শহীদি মৃত্যু দেন সে সৌভাগ্যবান। আমি শহীদি মৃত্যুর অধিকারী হলে তা হবে আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। আমার প্রতিটি রক্তকণিকা ইসলামী আন্দোলনকে বেগবান করবে ও জালেমের ধ্বংস ডেকে আনবে। আমি নিজের জন্য চিন্তিত নই। আমি দেশের ভবিষ্যৎ ও ইসলামী আন্দোলন নিয়ে চিন্তিত। আমি আমার জানা মতে কোনো অন্যায় করিনি।’

পরিবারের সদস্যদের তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা ধৈর্যের পরিচয় দেবে। একমাত্র ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালা ঘোষিত পুরস্কার পাওয়া সম্ভব। দুনিয়া নয়, আখেরাতের মুক্তিই আমার কাম্য। আমি দেশবাসীর কাছে আমার শাহাদাত কবুলিয়াতের জন্য দোয়া চাই। দেশবাসীর কাছে আমার সালাম পৌঁছে দিও।’ বিদায় বেলায় স্ত্রীর সঙ্গে শেষ কথা বলেন তিনি, ‘ধৈর্য ধরো, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখো। তোমার হক যথাযথভাবে আদায় করতে পারিনি বলে ক্ষমা করে দিও।’ প্রতি-উত্তরে স্ত্রী বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন কারাবন্দী থাকায় আপনার সেবা করতে পারিনি। বিদায় বেলায়ও পাশে থাকতে পারছি না। জীবন চলার পথে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় কোনো অন্যায় হয়ে থাকলে মাফ করে দিবেন।’ এ সময় খানিকটা আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হলেও কাদের মোল্লা ছিলেন দৃঢ়, অবিচল। এই দৃঢ়চিত্ততা কেবল আল্লাহর ওপর ভরসাকারী ঈমানদারগণই দেখাতে পারেন। কারণ তারা জান্নাতের বিনিময়ে দুনিয়ার সব বিসর্জন দিতে পারেন অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়।

হযরত উম্মে হারেসা বিনতে সারাকা থেকে বর্ণিত, ‘তিনি হুজুর (সা) এর দরবারে এসে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি কি হারেসা সম্পর্কে কিছু বলবেন না? জঙ্গে বদরের পূর্বে একটি অজ্ঞাত তীর এসে তার শরীরে বিঁধে যায় এবং তিনি শহীদ হন। যদি তিনি জান্নাতবাসী হয়ে থাকেন তাহলে আমি সবর করব, অন্যথায় প্রাণভরে কাঁদব। হুজুর (সা) জবাব দিলেন, হারেসার মা, বেহেশতে তো অনেক বেহেশতবাসীই রয়েছেন, তোমার ছেলে তো সেরা ফেরদাউসে রয়েছেন।’

১৫ মার্চ সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকায় শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা ‘শোক করিয়া লাভ নাই, শহীদি খুনের নজরানা চাই’ এই শিরোনামে লিখেছিলেন, ‘আমি কিন্তু এত হিংস্রতা, এত নিষ্ঠুরতা, এতটা অমানবিক আচরণে মোটেই বিস্মিত হই নাই। তিনজন শহীদের জন্য শোক করারও তেমন কিছু দেখি না। বরং অত্যন্ত প্রশান্তচিত্তে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করিয়া দেখিয়াছি, আমার মনে হইয়াছে ঘটনা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই অগ্রসর হইতেছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, পশুত্বের বিরুদ্ধে মানবতার, অমানুষদের বিরুদ্ধে মানুষের সর্বোপরি কুফরির বিরুদ্ধে ইসলামের সংগ্রামের ইতিহাসের এইভাবেই রক্তের অক্ষরে লেখা। কোনো নবীই এই পথ এড়াইতে পারেন নাই, কোনো মুজাদ্দিদের জন্যই ভিন্ন পথ ছিল না। কোনো ইমামও অন্য প্রকার পুষ্প আচ্ছাদিত পথের কথা চিন্তাও করেন নাই। সুতরাং এই যুগেও যাহারা ওই একই পথের যাত্রী বলিয়া দাবি করেন তাহাদের পথ ভিন্নতর কিছু হইবে কেমন করিয়া? যিনি এমন ঐতিহাসিক কথাগুলো লিখেছেন তিনি নিজেই আজ বিশ্বের খবরের পাতায় শিরোনাম। তিনি নিজেই তার জীবন উৎসর্গ করে সত্যের সাক্ষী হয়ে গেলেন আজ।

১৮৮২ সালে শহীদ শিবিরের শহীদ দিবস উপলক্ষে তিনি লিখেছেন : ‘মানুষকে যদি মানুষের মতো বাঁচিতে হয় তাহা হইলে এই মানুষখেকো আদর্শকে দুনিয়ার প্রতিটি প্রান্ত হইতে চিরতরে উৎখাত করিতে হইবে, নির্মূল করিতে হইবে। এই রক্তপিপাসু অনুসারীদের বিরুদ্ধে দুনিয়ার প্রতিটি প্রান্তে গড়িয়া তুলিতে হইবে প্রতিরোধ। বাংলার প্রতিটি জনতাকে এই বন্য আদর্শের আসল চেহারা আর অনুসারীদের আসল চরিত্র বুঝাইতে হইবে। দেশকে বাঁচাইতে হইলে সর্বোপরি ঈমান আকিদা লইয়া বাঁচিতে চাহিলে বলিষ্ঠ প্রত্যয়ের সাথে সিদ্ধান্ত লইতে হইবে। ঈমানদার প্রতিটি মানুষকে আজ অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তুত হইতে হইবে। অন্যথায় শুধু বুক চাপড়াইয়া শহীদদের জন্য শোক করিয়া কোনো লাভ নাই। আজ একটি গজলের কলিগুলি বড় আবেগে-আপ্লুত কণ্ঠে গাহিতে ইচ্ছা করিতেছে-

‘তোরি দেশের বাঁকে বাঁকে

লক্ষ শহীদ আজো ডাকে

তবুও কি তুই রইবি বেহুঁশ

আজি এ কথার জবাব যে চাই।’

জবাব দিতে হইলে মুখের কথায় অথবা মিটিং মিছিল আর প্রতিবাদ সভায় কাজ হইবে না। ঈমানের আলোতে প্রজ্জ্বলিত বক্ষের তাজা শহীদি খুনের নজরানা চাই।

আদর্শকে হত্যা করা যায়না। আল্লাহ তায়ালা বলেন,“যে অন্যায়ভাবে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করলো, সে যেন গোটা মানব জাতিকে হত্যা করলো।” রাসূল (সা:) বলেছেন, “বিচারক তিন ধরনের দুই ধরনের জাহান্নামী এক ধরনের জান্নাতী, যে সত্য জেনেও অন্যায় বিচারকার্য করে সে জাহান্নামী, যার বিচারকার্যের জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও বিচারকার্য করল সে জাহান্নামী, আর যে সত্যকে জানলো এবং সে অনুযায়ী বিচারে রায় দিল সে জান্নাতি” (ইবনে মাজাহ)। বিচারের সাথে মিথ্যা সাক্ষ্যদানকে তিনি শিরকের সমতুল্য বড় গুনাহ বলে উল্লেখ করেছেন। যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, মিথ্যা সাক্ষ্যদানে উদ্বুদ্ধ করে এবং জেনে-বুঝে এর পক্ষাবলম্বন করে এরা সবাই মুশরিক ও জালেম, জাহান্নামই তাদের ঠিকানা। আয়েশা (রা.) বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, “মুসলমানদের ওপর থেকে শাস্তি যতটা পারো রহিত করো। তাকে অব্যাহতি দেয়ার সুযোগ থাকলে অব্যাহতি দাও। কেননা শাসকের জন্য ভুলক্রমে শাস্তি দেয়ার চেয়ে ভুলক্রমে মাফ করা উত্তম।”

আওয়ামী লীগ হয়তো মনে করেছে যুদ্ধাপরাধের বিচারের মাধ্যমে জামায়াত নেতৃবৃন্দকে একের পর এক হত্যা করে ইসলামী আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করে দিবে। কিন্তু আল্লাহর ঘোষণা-“তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহর আলো নিভিয়ে দিতে চায়। আল্লাহ তাঁর আলোকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।” (৬১ঃ৮)

জেল-জুলুম-নির্যাতন, হত্যা, গুম, খুন চালিয়ে ইসলামী আন্দোলনকে স্তব্ধ করা যায় না, বরং দ্বীনের বিজয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। শহীদের রক্ত আর মজলুমের চোখের পানি কখনো বৃথা যায় না। রাসূল (সা:) মুয়ায (রা.) কে বললেন, হে মুয়ায! মাযলুমের দোয়া থেকে ভীত থাকবে, কারণ মাযলুম যখন আল্লাহর নিকট দোয়া করে তখন তার এবং আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকেনা। তাই আসুন, শোককে শক্তিতে পরিণত করে শহীদদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ বাস্তবায়ন করে গড়ে তুলি একটি সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ। মহান পরওয়ারদিগার শহীদ আবদুল কাদের মোল্লাসহ সকলকে শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমীন।।

লেখকঃ সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা 

সোর্সঃ সাপ্তাহিক সোনার বাংলা- ০৮/১২/২০১৭ইং