ঢাকা, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭, সোমবার রাত; ০৮:৩৫:৫৭
  

যুদ্ধপরাধরী আইন মানবাধিকার লঙ্ঘনের আরেক অক্টোপাস! - ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম


আধুনিক রাষ্ট্রের উৎপত্তির পূর্বে অধিকারের জন্ম হয়েছে নাকি রাষ্ট্রই আধিকার সৃস্টি করেছে তা নিয়ে পন্ডিত মহলে বিতর্ক আছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই যে, Legal Right আইনগত আধিকার হলো সেই স্বার্থ যা আইনের নীতি সমূহ দ্বারা স্বীকৃত ও সংরক্ষিত, যেমন কথা বলার আধিকার, চলা-ফেরার অধিকার, যার মধ্যে মানুষের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও ধর্মীয় আধিকার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ প্রসঙ্গে মনীষী Gettel বলেছেন- In a state of nature real liberty for all would be impossible.... অর্থাৎ রাষ্ট্র অধিকার ভোগের নিশ্চয়তা না দিলে সে অধিকার অর্থহীন। কিন্তু রাষ্ট্র-ই যদি সেই আধিকার ভোগে বাধা হয়ে দাড়াঁয়। অর্থাৎ রক্ষক যদি ভক্ষকের আসনে আসীন হয়। তখন-ই খর্ব হয় মানুষের মৌলিক অধিকার। আর ঘটে আইনের বিপত্তি ও মহাবির্যয়। মূলত মানুষের মৌলিক আধিকার ভূলুন্ঠিত হয়েছে পৃথিবীতে হিটলার ও মুসোলিনীর অক্ষশক্তির নৃসংসতা ও বর্বর কর্ম কান্ডে মাধ্যমে। যাতে স্তম্ভিত হয়েছে বিশ্ববিবেক। বাংলাদেশের শাসন ব্যাবস্থা এখন হিটলার ও মুসোলিনীর অক্ষশক্তির নৃসংসতা ও বর্বর কর্ম কান্ড কেও হার মানাতে বসেছে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, হত্যা, গুম, জুলুম, লুন্ঠন, রাহাজানি, অক্টোপাশের মত জাতিকে ঘিরে ফেলেছে। কোন রাষ্ট্র যখন মানুষের অধিকারের বিরুদ্ধে আবস্থান নিয়েছে তথন নাগরিকগণ সবচেয়ে বেশী অ-সহায় এর নিমজ্জিত হয়েছে।

সম্প্রতি আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট কতৃক বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার রিপোর্টে তাই প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া আমাদের দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা গুলোর রিপোটে সেই ভয়াবহ চিত্রই ফুটে উঠেছে।

বর্তমান আধুনিক সভ্য পৃথিবীতে মানবাধিকার এখন মানুষের জীবনের অখন্ডিত চেতনা বা বিশ্বাস। এটি এখন আন্তর্জাতিক আইনের অংশ হওয়ায় বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার একটি আন্দেলনে রুপান্তরিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে মনে করা হতো , মানবাধিকার কেবল কোন রাষ্ট্রেও অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। তাই কোন রাষ্ট্রেও নাগরিকের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে অপর কোন রাষ্ট্রীয় কতৃপক্ষ তা নিয়ে মাথা ঘামাতো না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ কে আলোড়িত না করলে ও সকল রাষ্ট্রের মানুষই ব্যাথা অনুভব করতো। আর এই মনোভাব থেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে জাতিসংঘের মানবাধিকারের সার্বজনীন সনদ। বাংলাদেশ ও এর স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে যুদ্ধপরাধ ইস্যু আমাদের অভ্যন্তরীণ বলে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের যেন কোন তোয়াক্কাই সরকার করছে না। বরং যুদ্ধপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে মানবাধিকারের সংরক্ষণ অথবা লঙ্ঘন যেন আইনমন্ত্রী আর প্রতিমন্ত্রীর নিজস্ব মর্জির ব্যাপার। এ যেন ” আমার মুরগী আমি যেভাবে ইচ্ছা জবাই করব কার কি বলার আছে”। মাননীয় আইনমন্ত্রী আর প্রতিমন্ত্রীর পৃথিবী এখন আর নিজস্ব মর্জি দিয়ে চলে না। এ গোঁয়ার্তুমী ধরতে গিয়ে পৃথিবীর বড় বড় ক্ষমতাধর শাসকরা কাবু হয়ে গিয়েছে জনগণের প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের মুখে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

এবার আসা যাক আওয়ামীলীগের প্রভূদের থেকে ধার করে নিয়ে আসা এজেন্ডা যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কল্প কাহিনী। এ আইনে মৌলিক মানবাধিকার স্থগিত করা হয়। যা কোন সভ্য সমাজ, দেশ ও জাতি কল্পনা করতে পারেনা। যা বাংলাদেশের সংবিধানের চুড়ান্ত লঙ্ঘন।

এখানে মনে রাখতে হবে পৃথিবীর যত জায়গায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, প্রায় তার সবটিই in the name of law তথা আইনের দোহাই দিয়েই হয়েছে। বর্তমান সরকার ও আইনের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ও আদালতকে ব্যবহার করে সেই অন্যায়টি-ই করছে বে-আইনী ভাবে। এটি ও শাসক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সাধারণ জনগণকে এক প্রকার ধোকা। এ ধোকাবাজীর রাজনীতি ও আইনী বিচার আমরা অতি সম্পতি জরুরী অবস্থার ফখরুদ্দীন এবং মইনুদ্দীনের সরকার সময়ে দেখেছি। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, সহ অধিকাংশ রাজনীতি বিদগণই সেই আইনের শাসনে দলিত মথিত হয়েছেন। অথচ আমাদের এই বিচারকরাই তখন এ চেয়ারে বসে একেকজনকে শত শত বছরের শাস্তি প্রদান করেছেন। আবার ঐ আদালত আর বিচারক রাই আবার এখন তা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিচ্ছেন। এই তো আইনের খেলা। এই জন্য বলা যায় পৃথিবীর সব আইন -ই মানবতার কল্যাণে রচিত হয়নি। আর সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই যুদ্ধপরাধ আইনকে black law বা কালো আইন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সরকার সম্ভবত বুঝতে পেরেছে তারা এই আইন দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারছে না, তাই এখন তারা সেফহোমের নামে নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে। যেটি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ছাড়া আর কিছু নয়। যদি নির্যাতনের টার্গেটই না থাকে, তাহলে তথাকথিত সেফহোম নাম দিয়ে টর্চার করাই কি সরকারের আসল টার্গেট? এর কোনটিরই সদত্তোর জুলুমবাজ আর মামলাবাজ সরকারের কাছে নেই।

এ পর্যন্ত আইনটির বিষয়ে সবচেয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠন গুলোর পক্ষ থেকে” হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এশিয়া বিভাগ, দ্য ওয়ার ক্রাইমস কমিশন অব দ্যা ইন্টারন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশন, দ্য ওয়ার ক্রাইমস প্রজেক্ট ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উল্লেখ যোগ্য।

তারা বলছে- প্রয়োজনীয় সংশোধন ছাড়া এই আইনের মাধ্যমে বিচার কাজ চালিয়ে গেলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিতর্ক বাড়বে। আইনটিকে সংশোধন করে যদি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা না হয় তাহলে এই আইনের মাধ্যমে বিচার কাজ পরিচালনা করা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির মানবাধিকার রক্ষা অসম্ভব হবে না। আইনটি বর্তমানে যে অবস্থায় আছে তাতে দায়মুক্তি থেকে বের হয়ে আসার যে উদ্যোগ বাংলাদেশ সরকার নিয়েছে তা যেমন চাপা পড়ে যাবে তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এ বার্তা ছড়িয়ে পড়বে যে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্যই এ আয়োজন করা হচ্ছে।

এই অভিমত এখন দেশ বিদেশের বিভিন্ন সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের। যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক মার্কিন দূত স্টিফেন জে. র‌্যাপ বাংলাদেশ দুবার সফর কালে বলেছেন, “১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হলে বিদ্যমান আইন সংস্কার করতে হবে”।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর জন বুজম্যান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে লেখা এক চিঠিতে ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আটকদের মৌলিক অধিকার খর্ব করার অভিযোগ করেছেন। এ পর্যন্ত যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের মানবাধিকার সমুন্নত রাখার এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রাখা হয়নি বলে অভিযোগ করেন।

ব্রিটিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অ্যালেন ডানকান ঢাকায় সফরে সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন হয়নি। এ বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করলে চলবে না।”

টাইম ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতে” বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার, আশঙ্কা করা হচ্ছে সরকার তার পরিচিত প্রতিপক্ষ এবং রাজনৈতিক শত্রুদেরকে দমন করতেই এ বিচারকে ব্যবহার করছে। সরকার যদি পুরোপুরিভাবে সেটা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এটা সমগ্র জাতির জন্য বিপর্যয় বয়ে আনবে।’

লন্ডনের The Economist পত্রিকার ২৬ মার্চ সংখ্যায় বলা হয়েছে, “এই বিচার আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এই বিষয়ে যে আগ্রহ শুরুর দিকে বিদেশের সরকারগুলোর মধ্যে ছিল তা এখন শেষ হয়ে গেছে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, “এ ট্রাইব্যুনালের প্রতি আমার কোন আস্থা নেই। এটাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হিসেবে বিশ্বাস করি না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই বেছে বেছে রাজনৈতিক নেতাদের আটক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আন্তর্জাতিক শব্দটি ছাড়া এখানে আন্তর্জাতিকতার কিছুই নেই”। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছে- ”আওয়ামীলীগ আগামী নির্বাচনে জিতার জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে। তিনি আওয়ামীলীগকে নিজের ঘর থেকে বিচার শুরুর আহবান জানান”। আ.স.ম রব বলেন ” যুদ্ধেপরাধের বিচার রাজনৈতিক ইস্যু”।

ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এক প্রেসব্রিফিং এ জনাব এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেছেন–” কথিত এ সেফ হোম ইতোমধ্যেই জনগণের নিকট টর্চার সেল হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রায় সাড়ে ১০ মাস ধরে মিথ্যা অভিযোগে বিনা বিচারে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে আওয়ামী লীগ সরকার আটকিয়ে রেখেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ দাঁড় করাতে পারেনি। মিথ্যা ও সাজানো বিভিন্ন মামলায় তাঁকে ইতোমধ্যেই ২৪ দিন রিমান্ডে নিয়ে অমানুসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। এরপর বিগত ৫ এপ্রিল ট্রাইবুনাল মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে জেলের অভ্যন্তরে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দেয়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ট্রাইবুনাল এ আদেশ পরিবর্তন করে ধানমন্ডির কথিত সেফ হোমে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুনঃআদেশ দেয়। কথিত সেফ হোমে নিয়ে প্রায় ৭০ বছর বয়স্ক এ প্রবীণ রাজনীতিবিদকে জিজ্ঞাসাবাদ নিঃসন্দেহে দূরভিসন্ধিমূলক। তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে জিজ্ঞাসাবাদের তারিখ ও সময় মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর আইনজীবীকে ৪৮ ঘন্টা আগে জানানোর নির্দেশ থাকলেও তা মানা হয়নি।” এ যেন যুদ্ধাপরাধের নামে আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন আওয়ামী অপরাজনীতির আরেক দলিল।

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ১৯৭১ সালে কোন যুদ্ধাপরাধ করেননি। কারন যিনি কোন যুদ্ধেই করলেন তার মানবতা বিরোধী কোন অপরাধের সাথেও তিনি জড়িত থাকার প্রশ্নটি ও অবান্তর। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৩৯ বছরে দেশের কোন থানায় তার বিরুদ্ধে কোন মামলা হয়নি, এমনকি একটি জিডি পর্যন্ত হয়নি। দালাল আইনে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যেও তিনি ছিলেন না। তাই এখন তার বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সাজানো এবং ইতিহাসের জঘন্য মিথ্যাচার কাল্পনিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছাড়া আর কিছুই নয়। দেশের একজন প্রথম শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর যে সাংবিধানিক অধিকারগুলো আছে তা ভূলুন্ঠিত করা হচ্ছে। মানবাধিকারকে পদদলিত করা হচ্ছে। এ সরকারের জন্য অতিব দুঃখের আওয়ামীলীগে দেশ পরিচালনা দক্ষ, এবং জানাশুনা বোদ্ধা রাজনীতিবিদের উপস্থিতি একবারেই কম নয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে রাজনৈতিক পুরাতন পার্টি হিসেবে। কিন্তু সরকারের এবার যেন বাম নির্ভরতা ও অরাজনৈতিক লোকের ক্ষমতায়ন বেশী। আর সরকারের ভাবমর্যাদা নির্ভর করে এমন জায়গা গুলোতে যাদের বসিয়েছেন তা রিতিমত সরকারকে বেকায়দায় ফেলার মত। যাদের নিয়ে ইতোমধ্যে নিজ দলের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। এটি আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের বহি:প্রকাশ।

দেশী-বিদেশী আইন বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ১৯৭৩-এর সংস্কারের কথা বলা হলেও সরকারের সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সরকার বর্তমান কালো আইন দিয়েই বিচারের নামে প্রহসন করে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে রাজনীতি অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ইতিহাস সাক্ষী ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে যড়যন্ত্র করে কেউ সফল হয়নি। যুদ্ধপরাধীদের বিচার নিয়ে আওয়ামীলীগ এখন রাজনৈতিক খেলায় মেতে উঠেছে। যুদ্ধপরাধের বিচার ইস্যুতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগের অনেক নেতাই এখন গোয়েবলস কে শুধু অতিক্রম-ই করেনি বরং গোয়েবলস আজ জীবিত থাকলে এখন আওয়ামীলীগের শিষ্যত্ব গ্রহণ করার সম্ভাবনা ছিল। গলাবাজি, বোমাবাজি, ডিগবাজীতে আওয়ামীলীগের তুলনা করার মত কিছু এখনো পৃথিবীতে অনাবিস্ককৃত। এদিক দিয়ে আওয়ামীলীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ সম্ববত অন্যদের থেকে এগিয়ে। এক বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ঘায়েল করতে গিয়ে তিনি বললেন ”আপনি স্বামী হারা একজন মহিলা গভীর রাত পর্যন্ত গুলশানের অফিসে কি করেন? আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত, তসবিহ পাঠ এমনকি তাহাজ্জুদের নামাজ ও পড়েন। তার হাতেই ইসলাম নিরাপদ। মাহবুবুল আলম হানিফ সাহেব তাহাজ্জুতের নামাজের মত অত্যন্ত গোপনীয় ইবাদতের বর্ণনা আমরা যখন টিভির পর্দায় আওয়ামীলীগের নেতাদের মুখসৃত বাণী যখন শুনি তখন এদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা আনন্দিত, গর্বিত, ও প্রীত হই এটাই স্বাভাবিক। কারণ শেখ হাসিনার মত একজন আল্লাহওয়ালা তাহাজ্জুদ গুজার ব্যক্তির শাসনামলে অনাচার বে-ইনসাফী তো আশা করা যায় না। এই দিক থেকে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকা কালে দেশের একজন অতিনগন্য নাগরিক হিসেবে অন্তত আমাদের চিন্তায় কোন কারণ নেই। আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য শুনলে মাঝে মধ্যে খোলাফায়ে রাশেদার শাসনামলের চিত্র ভেসে উঠে। মনে হয় খলিফা ওমরের যেমনি বলতেন\" আমার শাসনামলে ফোরাত নদীর তীরে একটি প্রাণীও যদি না খেয়ে মারা যায় তার জন্য আমাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে”। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আসলে প্রকৃত অবস্থা কি তাই? আপনি আল্লাহ কে সাক্ষী করে বলবেন কি? বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনম্যান্ট এর বাড়ী ছাড়া করা, ড. উইনুসকে গ্রামীন ব্যাংকের এমডি ও পদ ছাড়তে বাধ্য করা, আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে বিরোধী দলকে দমন-ই আপনার আসল লক্ষ্য নয় কি? এর উত্তর আওয়ামী গলাবাজরা যতই অস্বীকার করুক না কেন। প্রকৃত কারণ ব্যক্তিগত আক্রোশ, হিংসা, বিদ্ধেষ, ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পরায়নতাই আসল লক্ষ্য। আর সেই আক্রমনের সাথে যদি আইন, আদালত, কিংবা রাষ্ট্রীয় যন্ত্রেও উপস্থিতি ঘটে তাহলে তাহলে সেখানে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটে। এতে কোন সন্দেহ নেই। এই জন্যেই সম্ভবত নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আলাদা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

আসলে দেশ পরিচালনায় আওয়ামী লীগ সরকারের অযোগ্যতা, অদক্ষতা দেশবাসীকে সীমাহীন দুর্ভোগের দিকে ঠেলে দিয়েছে। জনদুর্ভোগ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইন-শৃংখলার চরম অবণতিতে মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। দুঃখ, কষ্ট আর ক্ষোভে মানুষ দিশেহারা। দিন দিন বিক্ষুব্ধ জনতা ফুঁসে ওঠেছে। সরকার ক্রমান্বয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের অনৈসলামীক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে দেশের আলেম সমাজের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনকেও সরকার ভয় পাচ্ছে। সরকারের সীমাহীন ব্যর্থতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিরোধীদল গণতান্ত্রিক আন্দোলনকেও সরকার সহ্য করতে পারছে না। ফলে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার পরিবর্তে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী পুলিশ বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে ফ্যাসিস্ট কায়দায় সরকার আন্দোলনকে দমানোর চেষ্টা করছে সরকার। মুক্তাঙ্গনে মুক্তভাবে কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকার গণতন্ত্রের কথা বললেও গণতন্ত্রকে হত্যা করার যাবতীয় কলা-কৌশল অবলম্বন করছে। সরকার বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে দেশকে বাকশালী শাসনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। সরকার সবকিছূ রুখতে যুদ্ধপরাধের যে ঢাল ব্যবহার করছে তাও এখন অকেজো। দেশী বিদেশীদের প্রচন্ড সমালোচনার মুখে যুদ্ধপরাধ ট্রাইবুনাল এখন যেন নিজেই অপরাধীর কাঠগড়ায় দন্ডায়মান! এই আইন দিয়ে যুদ্ধপরাধীদের বিচার না হলেও ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত, সমালোচিত, বিতর্কিত ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত, একটি কালো আইন হিসেবে হয়ত গিনেজবুকে এককালে স্থান করে নিতে সক্ষম হবে। কিন্তু সরকারকে মনে রাখা দরকার এ সরকারই শেষ সরকার নয়। আজ যারা কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখছেন তারাই যে ক্ষমতা হারালে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় না, এর বিপরীত এখনো আমরা দেখিনি।

লেখকঃ সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা
http://www.sonarbangladesh.com/articles/DrMohammadRejaulKarim