ঢাকা, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭, সোমবার রাত; ০৮:২৭:৫৩
  

মহাজোট সরকারে বামদের অদৃশ্য দাপট - ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিম


মহাজোট সরকারের বাম নির্ভরতার খবর প্রায় অনেকদিন থেকে আলোচিত হয়ে আসছে এবং এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেকেই ইতোমধ্যে আকারে ইঙ্গিতে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। কিন্তু বিষয়টি এখন অনেকটাই মিডিয়াতে আলোচনার বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। তা ছাড়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কথা বলায় আওয়ামী লীগের ডাকসাইটে নেতাদের রাজনৈতিক ভাগ্যবরণের বিষয়টিও তারা সামনে রাখছে। তা ছাড়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোটের মহাবিজয়, বিগত সময়ের আওয়ামী লীগের আলোচিত গডফাদার এবং ১/১১ পরবর্তী দলের মধ্যে শেখ হাসিনাকে দল থেকে বাদ দিতে তৎপর মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নে নেপথ্য নায়কদের এক লাঠি দিয়ে শাসন করে শেখ হাসিনা নিজ দলের মধ্যে অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় এখন শক্তিশালী অবস্থানে আছেন, কিন্তু ‘ওভার এন্টিবায়োটিক’ ফর্মুলায় বাস্তব রোগ যেমনি আপাতত ঢেকে থাকে, তেমনি শেখ হাসিনার ‘ওভার পাওয়ার’ কিছুটা দলের অভ্যন্তরীণ নাজুকতাকে আড়াল করে রেখেছে। অনেকই মনে করছে যে কোন সময় তা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। তার আলামত হলো সম্প্রতি ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির সাথে ভারতীয় দূতাবাসে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা বঞ্চিত চার নেতার গোপন বৈঠক।

যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের জন্য তা মোটেই কাক্সিক্ষত নয় এবং এ পথ ধরেই দলের অভ্যন্তরে স্বৈরতান্ত্রিকতার জন্ম হয় আর পরে তা একনায়কতান্ত্রিকতার পথকে সুগম করে। যেমনটি হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশাল কায়েমের ক্ষেত্রেও। শেখ মুজিবুর রহমান সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন নিজ দলের চাটুকারদের মাধ্যমে। যারা পীর-মুরিদানের মত সংশোধন, সমালোচনা, না করে অতি আনুগত্যপরায়ণতার পরিচয় দিতে গিয়ে দলের বারটা বাজিয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে তাদের আচরণ, আনুগত্য, ফোঁসফাঁস না মারার নীতি ভালো মনে হলেও সুদূরপ্রসারী তাদের নিকট অকল্যাণ ছাড়া কিছুই আশা করা যায় না। শেখ মুজিবুর রহমানকে এই শ্রেণীর বামরাই প্রলুদ্ধ করে বাকশাল কায়েম করিয়ে ছিলেন যদিও আজ ইতিহাসের বিচারে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য এটিই ছিল সবচেয়ে বড় ভুল। ২৮ অক্টোবর ২০০৬ পল্টন ময়দানে আওয়ামী লীগ লগি- বৈঠা দিয়ে প্রকাশ্য মানুষ হত্যা করে লাশের ওপর নাচানাচি করে উল্লাস প্রকাশ করেছে বাম ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা। ইতিহাসের এই জঘন্যতম তাণ্ডব গোটা বিশ্ববাসীকে হতবাক করেছে। অনেকেই মনে করছে ১/১১-এর আগে ও পরে নেপথ্যে বাংলাদেশের বামবুদ্বিজীবী ও রাজনীতিবিদদের ভূমিকা আওযামী লীগকে সবচেয়ে বেশি বিপথগামী করেছে। এখন আবার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে আওয়ামী লীগকে গভীর সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না তা উপলব্ধি করার চেষ্টা করছেন কি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!

সত্তোরের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বাম রাজনীতির অনেকটাই ছন্নছাড়া অবস্থা দেখা দেয়। সমাজতন্ত্রীরা ধনিক বা বুর্জোয়া শ্রেণীকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে সর্বহারা শ্রেণীর ক্ষমতা দখলেই বিশ্বাস করে। কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের চিন্তা শুরু হয় মূলত ষোড়শ শতাব্দী থেকে। চার্লস ফ্যুয়েরার, সেন্ট সাইমন, রবার্ট ওয়েন প্রমুখ এ ঘরানার দার্শনিক। প্রুধো অবশ্য নৈরাজ্যবাদিতায় বিশ্বাস করতেন। ১৯১৭ সালে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি রাশিয়ায় প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর ৮০-এর দশক থেকেই শুরু হয় সমাজতন্ত্রের পতন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাজতন্ত্রকে বর্জন করে তাদের মুক্তির জন্য শাশ্বত বিধান আল-ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সেখান থেকে সমাজতন্ত্রীদের আক্রোশের বস্তুতে পরিণত হয় ইসলাম। বিশ্বরাজনীতিতে এ পিছিয়ে পড়া ভাব কাটিয়ে উঠতে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে টিকে থাকার সংগ্রামে। বাংলাদেশে ও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এর মধ্যে তওবা করে বাম অনেকে রাজনীতি ছাড়লেও বিরাট অংশ এখন অন্য দলের আড়ালে থেকে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে সবচেয়ে বেশি তৎপর। সেই অভিযোগটি এখন তুঙ্গে মহাজোট সরকারের বাম ঘরানা মন্ত্রী, এমপি এবং প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।

গত ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ বাংলাদেশ প্রতিদিন এর এমনি এক রিপোর্টে নড়েচড়ে উঠলেন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ। রিপোর্টে বলা হয়- ‘‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের মন্ত্রিসভায় সাবেক কমিউনিস্ট ও ছাত্র ইউনিয়নের সমর্থকরাই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে। কমিউনিস্ট ছাড়াও সাবেক বামধারার সমর্থকদের অদৃশ্য জোট মন্ত্রিসভায় বিশেষভাবে আলোচিত। জ্যেষ্ঠতার তালিকায়ও সাবেক কমিউনিস্টদেরই অগ্রাধিকার। মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত প্রণয়নে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন, তাদের প্রায় সবাই এসেছেন বামধারার রাজনীতি থেকে। আর মূল ধারার অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বা এক সময় ছাত্রলীগ করতেন, এমন মন্ত্রীরা মন্ত্রিসভায় তুলনামূলক গুরুত্বহীন। কারণ তাদের বেশির ভাগই এসেছেন মফস্বল এলাকা থেকে এবং সেখানেও তারা ছিলেন মধ্যম সারির নেতা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কার্যত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সরকার চালাচ্ছে কমিউনিস্টরাই। সরকারে দলের নেতারা এখন গুরুত্বহীন।

মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর পরই অর্থমন্ত্রীর গুরুত্ব। সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন সমর্থক আবুল মাল আবদুল মুহিত সেই সৌভাগ্যবান মন্ত্রী। মন্ত্রিসভায় জ্যেষ্ঠতার তালিকায়ও প্রধানমন্ত্রীর পরই অর্থমন্ত্রীর নাম। প্রভাবশালী এই মন্ত্রী এরশাদের জাতীয় পার্টির সরকারেও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। সিলেট সদর আসন থেকে সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানকে হারিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে এবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন এই মন্ত্রী। মন্ত্রিসভায় আরেক প্রভাবশালী মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হলেও দলে মতিয়া চৌধুরী এখনো ‘কমিউনিস্ট’ হিসেবেই সমধিক পরিচিত। ছাত্রলীগের সঙ্গে যখন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব প্রকট, ঠিক সে মুহূর্তে তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সভানেত্রী। ছিলেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদকও। মন্ত্রিসভা গঠনের শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় কৃষি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন। শ্বশুরবাড়ির এলাকা শেরপুরের

সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আর মন্ত্রিসভা গঠনের শুরু থেকেই এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান এক সময় ছাত্র ইউনিয়ন করা ডা. অধ্যাপক আ ফ ম রুহুল হক। অর্থোপেডিকের খ্যাতনামা এই চিকিৎসক স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন দীর্ঘদিন। সাতক্ষীরা-৩ আসন থেকে এবার আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি নির্বাচিত হন তিনি। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে নিরক্ষরমুক্ত জাতি গঠনের অঙ্গীকার বিবেচনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। আর এ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন নূরুল ইসলাম নাহিদ। শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ কেবল ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গেই সম্পৃক্ত ছিলেন না, আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার আগের দিন পর্যন্ত তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সিলেট-৬ আসন থেকে ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে তিনি এবার এমপি নির্বাচিত হন। আইন মন্ত্রণালয় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। আর এমপি না হয়েও টেকনোক্র্যাট কোটায় এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান রাজনীতিতে ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে হাতেখড়ি নেয়া ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। আওয়ামী লীগে তার আনুষ্ঠানিক যোগদান না ঘটলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বরাবরই ভালো সম্পর্ক ছিল তার। স্ত্রী মাহফুজা খানমও ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী ছিলেন। ছিলেন ডাকসু ভিপিও। নানা কারণে পূর্ত মন্ত্রণালয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান। এ মন্ত্রণালয়ে এখনো কেউ পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পাননি বলে তিনিই কার্যত সংশ্লিষ্ট অলিখিতভাবে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। দোহার-নবাবগঞ্জ এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাকে হারিয়ে এবার তিনি এমপি নির্বাচিত হন। প্রকৌশলী ইয়াফেস ওসমান। এমপি না হয়েও টেকনোক্র্যাট কোটায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছেন এক সময়ের ছাত্র ইউনিয়নের ডাকসাইটে এই নেতা। এক-এগারোর প্রেক্ষাপটে কারাবন্দী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে ছড়া লিখে আলোচিত হন তিনি। দিলীপ বড়ুয়াকে কমিউনিস্ট ঘরানার লোক বলেই মনে করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। কারণ এখনো তিনি বামধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মহাজোটের শরিক দল হিসেবে টেকনোক্র্যাট কোটায় সরকার গঠনের শুরু থেকেই শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান দিলীপ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গেও তার বেশ ভালো সম্পর্ক। চীনে খালেদার সঙ্গে একবার সফরসঙ্গীও হয়েছিলেন তিনি। জনশ্রুতি রয়েছে, ওই সময় তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছে তারেক রহমানকে দেশের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। সাবেক বাম নেতা বর্তমান নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। বর্তমান মন্ত্রিসভায় তার অবস্থানও বেশ মজবুত। এর বাইরেও আরো দু-একজন প্রভাবশালী সদস্য বর্তমান মন্ত্রিসভায় আছেন, যারা কোনা না কোনা সময় ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

একই পত্রিকা ঐ তারিখে জাসদ-নির্ভর প্রশাসন এর চিত্রটি এভাবে তুলে ধরেন ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

‘আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের জনপ্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করছেন সাবেক জাসদ ছাত্রলীগ নেতারা। শীর্ষ আমলার পদে ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এক সময়ের আলোচিত জাসদ ছাত্রলীগ নেতারা। স্বরাষ্ট্র, সংস্থাপন, অর্থ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় এর মধ্যে রয়েছে। এসব দাপুটে ‘সচিব’ পদাধিকারীর নেতৃত্বেই রাষ্ট্রের প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এদের কলকাঠিতে দলনিরপেক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তারা পদায়ন এবং পদোন্নতিবঞ্চিত থেকে শুরু করে জনপ্রশাসনে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। রাজনৈতিক সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এসব আমলার ছলচাতুরীর লাগাম এখনই টেনে ধরা না হলে জনপ্রশাসনে আরো বিপত্তি দেখা দেবে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।

অভিযোগ থেকে জানা যায়, জাসদ ছাত্রলীগের একসময়ের এসব নেতা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে সরকারের জনস্বার্থমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে দীর্ঘসূত্রতায় আটকে রাখছেন। অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনস্বার্থমূলক কর্মকাণ্ড দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়নের জন্য একাধিকবার মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পত্র দিয়ে সচিবদের তাগিদও দেয়া হয়েছিল। এর পরও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এসব সচিব পদাধিকারী ক্রীড়নক বিভিন্ন সময়ে উপেক্ষা করে আসছেন। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মন্ত্রীদের দেয়া নির্দেশনা তারা সুকৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। আমলাতন্ত্রের মন্ত্রে দীক্ষিত রাষ্ট্রের এই শীর্ষ পদাধিকারীদের গুরুত্বপূর্ণ কাজের ফাইলে সিদ্ধান্ত নিষ্পত্তিতে বিলম্ব ঘটানো এখন সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।

সূত্র মতে, যে ফাইল সচিবদের দিয়েই নিষ্পত্তি হওয়ার কথা, সেই ফাইল এসব সচিবের অদৃশ্য ইশারায় মন্ত্রী পর্যন্ত তোলা হচ্ছে। ফলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ ঘটছে। প্রকারান্তরে জনপ্রশাসনে সমন্বয়হীনতা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এ ছাড়া প্রতিটি ফাইল মন্ত্রীর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রাখা যেন ‘প্রথা’য় পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আমলাদের ছলচাতুরীর এই লাগাম এখনই টেনে ধরা না হলে জনপ্রশাসনে আরো বিপত্তি দেখা দেবে বলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অপরদিকে জাসদ ছাত্রলীগ সমর্থিত এসব কর্মকর্তার কলকাঠিতে দলনিরপেক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তারা জনপ্রশাসনে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তারা পদায়ন ও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ঘুরেফিরে জাসদ ছাত্রলীগ সমর্থিতরাই পদায়ন ও পদোন্নতি পাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক বছরে যেসব কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত কিংবা সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন, তাদের অধিকাংশই জাসদ ছাত্রলীগ সমর্থিত। তাদের দেয়া তালিকা অনুযায়ী জনপ্রশাসনে পদায়ন ও পদোন্নতি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রীর সংস্থাপনবিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামকে ভুল বুঝিয়ে তারা জনপ্রশাসনে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছেন। ফলে তাদের পদায়ন ও পদোন্নতি অব্যাহত রয়েছে। চলতি মাসে জনপ্রশাসনে বড় প্যাকেজে যে পদোন্নতি হতে যাচ্ছে, সেখানে তাদের অনুসারীদের প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। আর এসব করা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সংস্থাপনবিষয়ক উপদেষ্টাকে অন্ধকারে রেখে।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন সাবেক জাসদ ছাত্রলীগের ডাকসাইটে নেতা মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ে সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন আবদুস সোবহান শিকদার, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগের সচিবের দায়িত্বে শফিকুর রহমান পাটোয়ারী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে আবু আলম শহীদ খান, বিএসটিআইয়ের চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা ফজলুল আহাদ। এ ছাড়া জনপ্রশাসনের পাদপীঠ সংস্থাপনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন জাসদ ছাত্রলীগের অন্যতম সাবেক নেতা ইকবাল মাহমুদ। তারা নিজেদের অনুগত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পোস্টিং দিয়ে জনপ্রশাসন পরিচালনা করছেন। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে তাদের অনুগত কর্মকর্তাদের পদায়নে সর্বদা তারা ব্যস্ত। এর সুযোগ নিয়ে এসব কর্মকর্তার আনুকূল্যে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জোট আমলে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা বহাল তবিয়তে রয়েছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, স্বরাষ্ট্র, সংস্থাপন, অর্থ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষার বর্তমান সচিবদের সবাই জাসদ সৃষ্ট গণবাহিনীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তারা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার শিকার হওয়ার পর বিষয়টিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। সাবেক জাসদ ছাত্রলীগের আদর্শের অনুসারী এসব সচিব পঁচাত্তর-পূর্ববর্তী ছাত্রজীবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ঘোর বিরোধিতায় ছিলেন। একানব্বইয়ের খালেদা সরকারের সময়ও ভোল পাল্টে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন। পরে ছিয়ানব্বইয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তারা জনপ্রশাসনে ভালোভাবেই প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রভাবের জাল বিস্তৃত হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় তাদের নির্দেশেই বর্তমান মহাজোট সরকারের জনপ্রশাসনও পরিচালিত হচ্ছে। কৌশলে সরকারের আস্থাভাজন হয়ে উঠেছেন জাসদ ছাত্রলীগের এসব সাবেক নেতা। (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১০ )

মহাজোট সরকারের এতজন ক্ষমতাধর প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি বাম ঘরানারই হয় তাহলে আওয়ামী লীগ কোথায়? আর এই পাওয়া না-পাওয়ার বেদনাই কি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের এত বে-পরওয়া ও বিশৃঙ্খলতার কারণ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার পিতাকে বামরাই সবচেয়ে বেশি বিপদে ফেলেছে, এখনও আপনার চতুর্দিকে তাদেরই আনাগোনা, দেখা যাক শেষ কোথায় গিয়ে দাড়ায়! লেখাটির ইতি টানছি-ইতালীয় বংশোদ্ভূত সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচির ‘ইন্টারভিউ উইথ হিস্টরি’ গ্রন্থের ৯ পৃষ্ঠার কয়েকটি লাইন দিয়ে ‘আমি শেখ মুজিবুর রহমানকে বললাম, মি. প্রাইম মিনিস্টার, সমাজতন্ত্রী কি না? তিনি উত্তর দিলেন, ‘হ্যা......’। তার কণ্ঠে দ্বিধা। তাকে আবার বললাম যে, সমাজতন্ত্র বলতে তিনি কী বুঝেন? তিনি উত্তর দিলেন, ‘সমাজতন্ত্র’। তাতে আমার মনে হলো সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তার যথার্থ ধারণা নেই।

ই-মেইলঃ- mrkarim_80@yahoo.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/DrMohammadRejaulKarim