ঢাকা, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭, সোমবার রাত; ০৮:২৮:১১
  

স্মৃতির পাতায় শহীদী ক্যাম্পাস ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম


স্মৃতির পাতায়
শহীদী ক্যাম্পাস

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসের সাথে মিশে আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস। দেশ ও জাতি গঠনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকার পাশাপাশি বিশ্বজোড়া এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের  পরিচিতি শহীদি ক্যাম্পাস হিসেবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ঊনিশজন মেধাবী তরুণ কে হত্যা করার ইতিহাস এখানেই ঘটিয়েছে মানুষ নামক ঐ নরপশুরা। শহীদ সাব্বির, হামিদ, আইয়ুব, জব্বার থেকে শুরু হয়ে আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জীবন্ত শহীদদের এ মিছিল এখন অনেক লম্বা ও বিস্তৃত। আমাদের সামনেই এ সারিতে মিলিত হয়েছেন আমাদের প্রিয় ভাই শহীদ সাইফুদ্দীন, শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী, শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন।  ১৯৯৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির শহীদ মোস্তাফিজুর রহমান ও শহীদ ইসমাঈল হোসেন সিরাজীর শাহাদাতের প্রায় ৮ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আবার জীবন দিতে হয়েছে আমাদের প্রিয় ভাই শহীদ সাইফুদ্দিন, শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী ও শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন কে। শহীদ সাইফুদ্দিন ভাইয়ের শাহাদাতের প্রাক্কালে আমি ছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি। আর আমাদের প্রিয় ভাই শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী ও শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন ভাইয়ের শাহাদাতের সময় আমার মত এই নগন্য মানুষটির উপর দায়িত্ব ছিল এ কাফেলার কেন্দ্রীয় সভাপতির। মানুষের এই ক্ষুদ্রজীবনে জীবনে অনেক ঘটনা মানুষকে প্রেরনা যোগায়।
আর আমার জীবন স্মৃতির অগ্রভাগ জুড়ে আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আনন্দ-বেদনার হাজারো ঘটনা। কিন্তু তা আজ শুধুই স্মৃতি। শহীদের সংস্পর্শের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য আজ আমি গর্বিত, কারণ আল্লাহর এমন প্রিয় বান্দার খুব কাছাকাছি থাকার সুযোগ আমি পেয়েছিলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখাকে মোবারকবাদ স্মারক বের করার এই মহতি উদ্যোগের জন্যে। আর এর মধ্যে দিয়ে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন স্মৃতির সাগরে আবার অবগাহন করার সুযোগটি করে দিল। সেই স্মৃতির ফ্রেমে আবদ্ধ ঘটনা গুলোর বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত কিছু কথা ও স্মৃতি প্রতিটি মুহূর্তেই আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তারই সামান্য উপস্থাপনা।
শাহাদাতের রক্ত জমিনকে করে উর্বর। আন্দোলনকে এগিয়ে দেয় অনেকদুর। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে সে ঐসব লোকদের সঙ্গী হবে যাদের নিয়ামত দান করা হয়েছে, তারা হলো-নবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং সালেহ, আর তাদের সান্নিধ্যই হলো উত্তম।”
আল্লাহর পথে লড়াই করা কর্তব্য সেই সব লোকেরই যারা পরকালের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন বিক্রয় করে দেয়, আল্লাহর পথে যে লড়াই করে ও নিহত হয়, কিংবা বিজয়ী হয়, তাকে আমরা অবশ্যই বিরাট ফল দান করব। ইহলৌকিক এ জীবন থেকে শহীদরা বিদায় নিয়েও পৃথিবীতে তারা অমরত্ব লাভ করেন। আর পরজগতে যাওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা তাদের জীবিত করে নিজের পর পরজগতে যাওয়ার সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা তাদের জীবিত করে নিজের মেহমান হিসেবে জান্নাতে থাকতে দেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদের মৃত মনে করো না, প্রকৃত পক্ষে তারা জীবন্ত, কিন্তু তাদের জীবন সম্পর্কে তোমরা অনুভব করতে পারো না” (আল-বাকারা: ১৫৪)। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন,  ‘তাদের প্রাণ সবুজ পাখির মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহর আরশের সাথে ঝুলন্ত রয়েছে তাদের আবাস, ভ্রমণ করে বেড়ায় তারা গোটা জান্নাত, অত:পর ফিরে আসে আবার নিজ নিজ আবাসে।” (মুসলিম, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
প্রিয় রাসুল (সা) বলেছেন: ‘‘শাহাদাত লাভকারী ব্যক্তি নিহত হবার কষ্ট অনুভব করে না। তবে তোমাদের কেউ পিঁপড়ার কামড়ে যতটুকু কষ্ট অনুভব করে, কেবল ততটুকুই অনুভব করে মাত্র।’ (তিরমিযী)
শহীদ নোমানী সম্পর্কে আমাকে কিছু লিখতে হবে। এই মুহূর্তে শহীদ নোমানীর সাথে প্রথম সাক্ষাতের কথা খুব করে মনে পড়ছে। দিন-ক্ষণ মনে নেই, এসএম হলের সামনে তার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। হাস্যোজ্জ্বল, মায়াবী চেহারার সুঠাম দেহের অধিকারী নোমানীকে প্রথম দেখাতেই নেতৃত্বের গুণাবলী সম্পন্ন মনে হয়েছে। জানলাম, তিনি কর্মী। বললেন, ‘কাম্পাসে এসে দাওয়াত পেয়েছি।’ আচরণে ও কথায়  নম্র ও বিনয়ী নোমানীকে জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘দ্রুত সাথী হয়ে যান।’ এর কিছু দিন পরেই সাথী শপথ নিতে আসলেন তিনি। কন্টাক্ট করে বুঝলাম তার মেধার গভীরতা। শপথের পর তাকে দ্রুত সদস্য হতে বললাম। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল এই ভাইটি অনেক বড় দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। এতো অল্প সময়েই সদস্য হলেন তিনি। প্রথমে এলাকার দায়িত্ব দেয়া হয়। সবাই তার চাল-চলনে, আচার-আচরণে, মেধা ও যোগ্যতায় মুগ্ধ। তার সুন্দর বক্তব্য, অপূর্ব সুন্দর তেলাওয়াত তাকে সবার প্রিয় মানুষে পরিণত করল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পরে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হলেন। এতো অল্প সময়ে এতদূর অগ্রসর হয়ে দায়িত্ব পালনের নজিরও করেছেন শহীদ নোমানী । আমি তাকে কোনদিন রাগান্বিত, বিরক্ত হতে দেখিনি। সদা নিশ্চুপ, কিন্তু ছিলেন অবিচল।
ঘটনার আগের দিন রাত থেকে শুরু করে শাহাদাতের কয়েক মিনিট পূর্ব পর্যন্ত অনেকবার কথা হয়েছে তার সাথে। কিন্তু তিনি ছিলেন ধীর স্থির, প্রতিটি সময়ে তিনি আমাদের সাহস যুগিয়েছেন। রাত থেকে হলে তল্লাসী, ফজর থেকে শুরু করে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি; দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা জিম্মি করে নির্যাতন করার ঘটনা পিলখানার সেই ভয়াল জিম্মিদশা ও সেনা হত্যারই যেন আর এক অধ্যায়। এই পাশবিকতা শুধুমাত্র নরপশু হিংস্র হায়েনাদের পক্ষেই সম্ভব।
দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা স্তব্ধ গোটা ক্যাম্পাস। সেদিন যেন ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী, পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একযোগে লাশের খেলায় মত্ত। সব জায়গায় কথা বলে যখন নিরুপায়, তখন আমাদের করণীয় শেষ করলামÑ কখনো ফোনে, কখনো জায়নামাযে। পরিষদের ভাইয়েরা একসাথে বসে সবাই মিলে মহান রবের দরবারে হাত তুলে বললাম, ‘পরওয়ারদিগার! আমাদের যেখানে শেষ, তোমার সেখানে শুরু।’ চিৎকার করে তাঁর কাছে ফরিয়াদ করলাম, ‘আয় আল্লাহ, এই ভাইদের জীবন তোমার কাছেই সোপর্দ করলাম। তুমি আমাদের পরীক্ষা সহজ কর। প্রভু গো, শহীদের রক্তে কেনা এই জমিন থেকে আমাদের বিতাড়িত করো না!’ সেই কান্নার আওয়াজ এখনো কানে ভাসে। অতঃপর বিজয়ী হলাম ঠিকই তবে মূল্য দিতে হলো অনেক চড়া।
নোমানী ভাইয়ের কাছে যতবারই জানতে চেয়েছি কি খবর, তিনি বলেছেন কোন অসুবিধা নেই। এই তো ঠিক হয়ে যাচ্ছে। সেদিন গোটা ক্যাম্পাসে সবাইকে মুক্ত করতে নোমানী ভাইয়ের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। সর্বশেষ তিনি যখন জানতে পারলেন আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা হলে পুলিশ ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের হাতে আটকরত সাংগঠনিক সম্পাদকসহ ৯ জনকে হত্যা করতে যাচ্ছে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা, তখনি আল্লাহর পথের অকুতোভয় সৈনিক নিজের জীবনের বিনিময়ে ভাইদের উদ্ধার করেন। তখন পুলিশ ও র‌্যাব-এর সহায়তায় ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা শিবির কর্মীদের উপর হামলা করে। পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ এবং রক্তলোলুপ ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র হামলায় আমাদের অনেক ভাই আহত হয়। উন্মাদের মত ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা নোমানী ভাইয়ের মাথায় ধারালো রামদা দিয়ে উপর্যুপরি কোপ দিলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা খুনের নেশায় এমনই উন্মত্ত হয়েছিল যে শহীদ নোমানীর মৃত্যু নিশ্চিত জানার পরও তারা রামদা দিয়ে তার বাম হাতের আঙুল কেটে ফেলে এবং মাথায় কুপিয়ে আঘাত করে মাথার মগজ বের করে ফেলে। বয়ে যায় রক্তের স্রোতধারা। যে মাথা ছিল মহাগ্রন্থ আল কুরআনের, তা তখন দ্বিখ-িত; যে কপাল আল্লাহকে সিজদা করতো, তা তখন রক্তাক্ত; যে হাতের ইশারায় মানুষকে দ্বীনের পথে ডাকতেন, সে হাতের আঙুল তখন হাত থেকে বিচ্ছিন্ন। মুহূর্তে লাল হয়ে গেল মতিহারের সবুজ চত্বর। ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে যান কর্মচঞ্চল প্রিয় ভাই নোমানী। নিথর হয়ে যায় বলিষ্ট নেতৃত্বের সাহসী মানুষটির সুঠাম দেহ। বীরবেশে পান করেন শাহাদাতের অমিয় সুধা। আমাদের বুক ভাসিয়ে মহান রবের সান্নিধ্যে চলে যান প্রিয় ভাই শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। কয়েক মিনিট পরেই খবর এলো গোটা ক্যাম্পাস শিবিরের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু শহীদ নোমানীর শাহাদাতের খবরে ততক্ষণে তার পিতা ও মাতা বাকরুদ্ধ। সন্তানহারা পিতার নির্বাক জিজ্ঞাসা আর বৃদ্ধা মায়ের করুণ রোনাজারির প্রশ্নের কি জবাব দেবেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন? সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠকে ৬ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে নোমানীকে হত্যার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এড়াবেন  কিভাবে?
মাত্র একমাস পর যে ভাইটি মাস্টার্স পরীক্ষার সার্টিফিকেট নিয়ে মা বাবার কাছে ফিরে যেতেন, আজ তিনি শুধুই স্মৃতি। কি বলে সান্ত¡না দেবো তার আব্বা আম্মাকে? সদা হাস্যোজ্জ্বল নোমানী শুধু মেধাবী ছাত্রই ছিলেন না, সাধারণ ছাত্রদের কল্যাণে কত না ভূমিকা রেখেছেন তিনি। এমনকি দেশের কল্যাণেও বহু ভূমিকা রেখেছেন। তার মাঝে ছিল বাংলাদেশকে গড়ার তীব্র আকাক্সক্ষা, ছিল দীপ্ত শপথ। তিনি ছিলেন শিল্পী ও লেখক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্নেহভাজন ছাত্র, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং ছাত্র-ছাত্রীর প্রিয় বন্ধু। সেদিন যখন আমেরিকা, লন্ডন, মক্কা শরীফসহ পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন করে সবাই খোঁজখবর নিচ্ছে, শহীদদের জন্য সর্বত্র দো’আ চলছে, তখন মনে হচ্ছিল যে, আমাদের শহীদেরা কতো বেশি ধন্য ও মর্যাদাবান! আমরা হয়তো হারিয়ে যাবো কিন্তু তারা অমর হয়ে থাকবে চিরকাল। শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী আজ একটি ইতিহাস।
আমরা আমাদের প্রিয় সাথী নোমানী কে ফিরে পাবো না। আমরা এভাবে ১৩৮ জন সাথী-ভাইকে হারিয়েছি। কিন্তু এর শেষ কোথায়? আর কত মায়ের বুক খালি হবে? আর কত ভাই-বোনের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হবে? আর কত দিন হত্যা, সন্ত্রাস, লুণ্ঠন চালিয়ে যাবে ছাত্রলীগের মানুষরূপী নরপশুরা। সত্য-মিথ্যার চিরন্তন আদর্শিক দ্বন্দ্বের সাহসী সৈনিক নোমানী ও রমজান বিশ্বাস আর নির্মাণে ছিলেন অকুতোভয়। দীপ্ত পথচলা আর আল্লাহভীতি ঘিরেই তাদের জীবন। আজ তারা আল্লাহর মেহমান, তারা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। কিন্তু আমরা জানি, শহীদ নোমানী শাহাদাত এ আন্দোলনকে পিছিয়ে দেয়নি বরং এগিয়ে নিয়েছে বহু দূর। এ সীমানা পরিমাপ আমাদের সাধ্যের বাইরে। আর আমাদের দায়িত্বের পরিধিও বেড়ে গেল অনেক দূর। সে সীমানাও অজানা।  যারা শহীদ নোমানী কে ভালোবাসেন, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে শোককে শক্তিতে পরিণত করে এ কাফেলাকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়া। এতেই তাদের আত্মা শান্তি পাবে।
শহীদ নোমানী ভাইয়ের মা আজ বাকরুদ্ধ। তিনি বলেনÑ ‘আহ্! আমার এতো আদরের বাবাকে তারা কিভাবে কুপিয়ে হত্যা করলো? আমি যদি সেখানে থাকতাম, তাহলে বলতাম, তোমরা আমাকে কোপ দাও কিন্তু আমার কলিজার টুকরো নোমানীকে আঘাত করো না।’ শহীদের বাবা জনাব হাবিবুল্লাহ নিজেই সন্তানের জানাযা পড়ান। তিনি জানাযার পূর্বে বলেন, ‘হে আল্লাহ, আমি তো তোমার কাছে চেয়েছিলাম আমার ছেলে আমার জানাযা পড়াবে, কিন্তু আমি আজ ছেলের জানাযা পড়াচ্ছি। আর পিঠে বহন করছি তার কফিন। মাবুদ গো, তুমি শুধু আমার ছেলেকে শহীদ হিসেবে কবুল করো। কি অপরাধ ছিল আমার সন্তানের? আমি তোমার কাছেই এই হত্যার বিচার চাই।’ ছোট ভাতিজা-ভাতিজী কিছুই বুঝেনা, তারা বাকরুদ্ধ। ছোট দুই শিশুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত¡নার ভাষা আর খুঁজে পেলাম না। তাদেরকে আদর করার প্রিয় চাচ্চু আর নেই। ‘কেন মারা হল তাদের প্রিয় চাচ্চুকে?’ এই হল তাদের জিজ্ঞাসা।
প্রিয় ভাইদের হারিয়ে আজ আমরা শোকাহত। তার বৃদ্ধ বাবা-মা আর পরিবারের সদস্যরা তাদেরকে হারানোর বেদনায় জ্বলতে থাকবে প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ, প্রতিটি মুহূর্ত। মহান রবের দরবারে সন্তান হারা মায়ের আহাজারি আর প্রতিরাতে তাহাজ্জুদের নামাজ শেষে চোখের পানি কি কোনই কাজে আসবেনা? আসবে, অবশ্যই আসবে। একদিন তারা পাবেন এই রোনাজারির পুরস্কার। আল্লাহর সম্মানিত অতিথি হবেন শহীদের পিতা মাতা হিসেবে। সেদিন জান্নাতের সবুজ পাখি হয়ে উড়তে থাকবেন শহীদেরা। এটাই তো শহীদের চূড়ান্ত সফলতা! ন্যায় ও বাতিলের এই দ্বন্দ্ব কোন সাময়িক বিষয় নয়, এটি চিরস্থায়ী আদর্শিক দ্বন্দ্বেরই ধারাবাহিকতা মাত্র। শাহাদাত ইসলামী আন্দোলনের বিপ্লবের সিঁড়ি, কর্মীদের প্রেরণার বাতিঘর, উজ্জীবনী শক্তি, নতুন করে পথচলার সাহস। আর খুনীরা হয় ক্ষতিগ্রস্ত, ভীত ও সন্ত্রস্ত। তবে ওরা থেমে থাকেনা। চালিয়ে যায় একের পর এক মানুষ হত্যা। কেননা, ওদের সত্ত কলুষিত। তবে আমাদের বিশ্বাস এই দুনিয়ার আদালতে এর নায্য বিচার না হলেও আল্লাহর আদালত থেকে খুনিরা রেহাই পাবে না।
ইমাম মালিকের (র) সূত্রে কুরতুবী গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে এভাবে: হযরত ইবনে জামুহ (রা) এবং আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) উভয় আনসার সাহাবীই উহুদের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। তাদের উভয়কে একই কবরে সমাধিস্থ করা হয়। এর চল্লিশ বছর পর একবার প্রবল বেগে পানি প্রবাহিত হওয়ায় তাদের কবর ভেঙ্গে যায়। পানির প্রবল চাপ দেখে যখন অন্যত্র সমাধিস্থ করার জন্য তাদের কবর খনন করা হলো তখন তাদের ঠিক সে অবস্থায় পাওয়া গেল যে অবস্থায় তাদেরকে দাফন করা হয়েছিল। মুয়াবিয়া (রা) তার শাসনামলে মদীনায় কূপ খনন করতে মনস্থ করলেন। কুপ খননের আওতায় উহুদ যুদ্ধের শহীদের কবর পড়ে গেল। মুআবিয়া (রা) ঘোষণা দিলেন  তোমরা তোমাদের আত্মীয় স্বজনের মৃত দেহ অন্যত্র নিয়ে যাও। এ ঘোষণার পর শবদেহ উঠিয়ে ফেলা হলো। দেখা গেল তারা যে অবস্থায় নিহত হয়েছিলেন ঠিক সেই অবস্থায়ই রয়েছেন। খনন কাজের কোন এক পর্যায়ে হযরত হামজার (রা) পায়ে কোদালের আঘাত লেগে গেলে সাথে সাথে তা থেকে রক্ত ক্ষরণ  শুরু হয়, এ ঘটনা ঘটে উহুদ যুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পর। বস্তুত এসব ঘটনা দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয যে আল্লাহ তায়ালা শহীদদের লাশ পঁচতে দেন না।
যে ব্যক্তি যুদ্ধ ক্ষেত্রে শাহাদাত বরণ করেন তাকে রক্ত ভেজা কাপড়ে রক্তাক্ত দেখে কোন প্রকার গোসল ছাড়াই দাফন করা হয়। তাকে নতুন কাপড়ের কফিন পরানো হয় না। শাহাদাতের সময় তার দেহে যে কাপড়  থাকে সে কাপড়েই তাকে দাফন করা হয়। শহীদদের ব্যাপারে ইসলামের বিধান এটাই। এবং এ অবস্থায়ই তারা হাশরে ময়দানে উঠবে। ক্ষতস্থান থেকে তখনও রক্ত বের হতে থাকবে। রসূলে খোদা (সা) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে কিয়ামতের দিন সেই আঘাত নিয়েই সে উঠবে আর তার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে এবং রং হবে রক্তের মতই, কিন্তু গন্ধ হবে মিশকের মত। (বুখারী ও মুসলিম: আবু  হোরায়রা (রা) অন্য হাদীসে উল্লেখ করেছেন নবী পাক (সা) বলেন, ‘‘কসম সেই সত্তার মুহাম্মদের প্রাণ যার হাতের মুঠোয়, কেউ আল্লহর পথে কোনো আঘাত পেলে কিয়ামতের দিন সে আঘাত নিয়ে হাজির হবে। আর সে আঘাতের অবস্থা হবে ঠিক মিশকের মতো” (বুখারী ও মুসিলম)। এটা শহীদদের কত বড় সৌভাগ্য শহীদ বৃদ্ধ মা এখনো রাত জেগে তার সন্তানের চোখের পানি ফেলেন। কুরআন মজীদে বলা হয়েছে, কোন দৃষ্টিই আল্লাহর দর্শন লাভ করতে সক্ষম নয়। কোন নবীও আল্লাহকে দেখতে পাননি কিন্তু শহীদরা মৃত্যুর পরপরই আল্লহর দর্শন লাভ করেন। ওহুদ যুদ্ধে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম শাহাদাত লাভ করেন যুদ্ধের পর রাসূল করীম (সা) শহীদদের পুত্র প্রখ্যাত সাহাবী হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহকে সান্ত¡না দিতে গিয়ে বলেন,Ñ ‘হে জাবির, আমি কি তোমাকে তোমার পিতার সঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সাক্ষাতের সুসংবাদ দেব না: জাবির বললেন অবশ্যই দিন হে আল্লাহর রাসূল, তখন তিনি বলেন: আল্লাহ কখনো  অন্তরালবিহীন মুখোমুখি কথা বলেন নি। তিনি বলেন: হে আমার গোলাম তোমার যা খুশি আমার নিকট চাও। আমি তোমায় দান করবো। তিনি জবাবে বলেছেন, ‘হে আমার মনিব। আমাকে জীবিত করে আবার পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিন আবার আপনার পথে শহীদ হয়ে আসি।’ তখন আল্লাহ তাকে বলেন, ‘আমার এ ফয়সালা তো পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছি যে, মৃত লোকেরা ফিরে যাবে না।’ তখন তোমার পিতা আরজ করেন, ‘আমার মনিব তবে অন্তত আমাকে যে সম্মান ও মর্যদা আপনি দান করেছেন, তার সুসংবাদ পৃথিবীবাসীদের জানিয়ে দিন।’ তখন আল্লাহ নিন্মোক্ত আয়াতটি নাযিল করেন: “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে তোমরা মৃত  মনে করো না, বরং তারা জীবিত।” (জামে আত-তিরমিযী, সুনানে নাসায়ী : জাবির ইবনে আবদুল্লাহ)
শাহাদাত মুমিন জীবনের বাসনা। বাতিলের ধ্বজাধারীরা হয়তো শহীদ রমজান ও নোমানীকে হত্যা করে আন্দোলন পিছিয়ে দিতে চায় কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে হত্যা, জেল-যুলুম চালিয়ে কোন আদর্শিক আন্দোলনকে স্তব্ধ করা যায় না। শহীদ নোমানী ও রমজানের মত সন্তানদের হারিয়ে তার পরিবারকে কষ্টের পাহাড় বয়ে বেড়াতে হবে আজীবন। সংগঠন তাদের নেতৃত্বের শূন্যতা অনুভব করবে অনেকদিন। কিন্তু তাদের রক্তের যোজনায় জন্ম নিবে আল্লাহর দ্বীনের অকুতোভয় অগনিত সৈনিক।
শহীদদের অফুরন্ত মর্যদার আরেক বিশেষ দিক হচ্ছে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে শহীদদেরকে উচ্চ মর্যদার এক বিশেষ মডেল হিসেবে নির্ণয় করা হয়েছে। যেমন কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর এবং রাসূলের আনুগত্য করবে, সে ঐসব লোকদের সঙ্গী হবে, যাদের প্রতি আল্লাহর তায়ালা নিয়ামত দান করেছেন। তারা হচ্ছেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং সালেহ লোকগণ। প্রকৃত অবস্থা জানার জন্যে আল্লাহর জ্ঞানই যথেষ্ট। (নিসা : ৬৯-৭০)
এ আয়াতে পরকালীন উচ্চ মর্যদার কয়েকটি স্তরের কথা উল্লেখ করা হয়েছেÑ অর্থাৎ (১) নবীগণের স্তর, (২) সিদ্দীকগণের স্তর (৩) শহীদগণের স্তর (৪) সালেহ বান্দাদের স্তর।
তিরমিযী, ইবনে মাজাহ হাদীস গ্রন্থে মেকদাম ইবনে মাদীকরব বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন, ‘একজন শহীদকে তার আত্মীয় স্বজনের জন্য সুপারিশ করার অধিকার দেয়া হবে।’
তাই আল্লাহ তায়ালা যদি কারো সন্তানকে শাহাদাতের মর্যদা প্রদান করেন তবে তারা শহীদদের পিতামাতা হবার গৌরব অর্জন করেন। তাদের জন্য এর চেয়েও খুশির বিষয় হলো তারা তাদের শহীদ সন্তানের সুপারিশ লাভের আশা পোষণ করতে পারেন, একজন শহীদ যেমন তার বংশে, পরিবারে এক শাশ্বত ঐতিহ্য সৃষ্টি করে যান তেমনি আবার তার অনুসারীদের ছাড়াও তার আপন বংশের লোকদেরকে চিরদিন জিহাদের জন্য অনুপ্রাণিত করে থাকেন। সুতরাং মুমিনদের দৃষ্টিতে শহীদ পরিবার অত্যন্ত সম্মানীয় এক আদর্শ পরিবার। শহীদের পিতা-মাতা মুমিনদের নিকট শ্রদ্ধাস্পদ, শহীদের সন্তান, স্ত্রী, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনকে সকল মুমিন নিজেদেরই আত্মীয়-স্বজন মনে করে। এসব দিক থেকেই শহীদ পরিবার গৌরবান্বিত। মহান আল্লহ শহীদদের জন্যে অসংখ্য পুরস্কারের ব্যবস্থা রেখেছেন। তাদের জন্যে নির্ধারিত ক্ষমা, মর্যাদা ও বিরাট পুরস্কারের কথা শুনে কার না ঈর্ষা হবে? আমার প্রিয় রাসূল (সা) বলেছেন, ‘‘আল্লাহর নিকট শহীদদের জন্যে ছয়টি পুরস্কার রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে: 
ক) প্রথম রক্ত বিন্দু ঝরতেই তাকে মাফ করে দেয়া হয় এবং জান্নাতে যে তার আবাসস্থল তা চাক্ষুস দেখানো হয়। খ) তাকে কবরের আযাব থেকে রেহাই দেয়া হয়। গ) সে ভয়ানক আতঙ্ক  থেকে নিরাপদ থাকে।  ঘ) তাকে সম্মানের টুপি পরিয়ে দেয়া হবে, যার এক একটি ‘ইয়াকুত’ পৃথিবী এবং পৃথিবীর মধ্যে যা কিছু আছে তা থেকেও উত্তম।  ঙ) তাকে উপঢৌকন স্বরূপ আনত: নয়না হুর প্রদান করা হবে এবং  চ) তাকে সত্তর জন আত্মীয় স্বজনের জন্যে সুপারিশ করার ক্ষমতা প্রদান করা হবে (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মেকদাম ইবনে মাদ’দীকরব)।  হযরত আবু আইয়ূব আনসারী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,  রাসূলে করীম (সা) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শত্রুর সম্মুখীন হলো এবং তার মুকাবেলায় অটল অবিচল এমনকি এমন অবস্থায় নিহত হয়ে গেল তাকে কবরে কোন প্রকার চিন্তার সম্মুখীন হতে হবে না।’ (থাবরানী)
১৪ জানুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আরবী বিভাগের ১ম বর্ষের ছাত্র সাইফুদ্দীন ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের আতর্কিত হামলায় আহত হন।
শহীদের বিভিন্ন নিয়ামত এবং অনুগ্রহ রাজির ব্যাপারে আল কুরআনে বহু প্রমাণ মেলে। তাদের সুসংবাদের কোন শেষ নেই। আল্লাহ বলেন, “যে সব লোক আল্লাহর পথে হিজরত করেছে, পরে নিহত হয়েছে কিংবা মরে গেছে আল্লাহ তাদেরকে রিযকে হাসানা দান করবেন। নি:সন্দেহে আল্লাহ উৎকৃষ্টতম রিযিকদাতা। তিনি তাদের এমন স্থানে পৌঁছবেন যাতে তারা সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।” (আল-হাজ্জ: ৫৮-৫৯) অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা যদি আল্লাহর পথে নিহত হও কিংবা মরে যাও তবে আল্লাহর যে রহমত ও দান  তোমাদের নসীব হবে, তা এইসব লোকেরা যা কিছু সঞ্চয় করেছে তা থেকে অনেক উত্তম।’’ (আলে ইমরান: ১৫৭)
যারা শাহাদাতের জযবা নিয়ে আল্লাহ পথে সংগ্রাম করে অতপর এ সংগ্রামে তারা শহীদ হোক কিংবা গাজী হিসেবে মৃত্যু বরণ করুক উভয় অবস্থাতেই আল্লাহর নিকট থেকে তারা সমান প্রতিদান পাবে বলে এ আয়াতগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। মুজাহিদরা খোদাদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে শহীদ কিংবা গাজী হোক উভয় অবস্থাতেই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদের জন্য মহা পুরস্কারের কথা ঘোষণা করেছেন। এই মহা পুরস্কার তারাই লাভ করবে যারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবনকে বিক্রি করে দেয়ার মতো সৎসাহস রাখে। আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘সেইসব লোকদেরই আল্লাহর পথে লড়াই করা কর্তব্য, যারা পরকালের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবনকে বিক্রয় করে দেয়, যারা আল্লাহর পথে লড়াই করে এবং নিহত কিংবা বিজয়ী হয়। আমরা তাকে অবশ্যই বিরাট পুরস্কার দান করবো।” (সুরা আন-নিসা: ৭৪)
সূরা আলে ইমরানে শহীদদের প্রাপ্য পুরস্কারসমূহ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন ‘তাদের সকল অপরাধ আমি ক্ষমা করে দেব। আর এমন জান্নাত তাদের দান করবো যার তলদেশে রয়েছে সদা প্রবাহমান ঝর্ণাধারা:  এ হচ্ছে আল্লাহর নিকট তাদের পুরস্কার, আর আল্লাহর নিকট রয়েছে সর্বোত্তম পুরস্কার।’ (আল ইমরান: ১৩৬)
রাসূলে খোদা (সা) নিজেও কিছু সংখ্যক লোককে উপরোক্ত লোকদের সাহচর্য লাভে সক্ষম হবার সুসংবাদ দিয়ে গেছেন।  যেমন : একবার এক ব্যক্তি নবী পাকের (সা) নিকট এসে বললো, ‘ওগো আল্লাহর রাসূল, আমি সাক্ষ্য দিয়েছি আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করি, আমার মালের যাকাত পরিশোধ করি এবং রমজান মাসের রোজা রাখি।” তার বক্তব্য শুনে নবী পাক (সা) বললেন, তুমি যা বললে এর উপর কায়েম থেকে যে মারা যাবে কিয়ামতের দিন সে নবী, সিদ্দীক ও শহীদগণের সাথে থাকবে।” (মুসনাদে আহমদ, আমর ইবনে মাররাহ আর জুহহানী।)
আমাদের কাছে একথা পরিস্কার হলো, শাহাদাত এমন একটি উচ্চ মর্যাদা, যে পর্যায়ে উপনীত হওয়া প্রকৃত ঈমানদার মাত্রেরই কাম্য। সিদ্দীক ও শহীদদের চাইতে উচ্চ মর্যাদায় উপনীত হবার আর কোন অবকাশই নেই। সুতরাং শাহাদাত উচ্চ মর্যাদার মডেল। শাহাদাতের এত সম্মান আমাদেরকে শাহাদাতের লোভী করে তোলে। শহীদদের রেখে যাওয়া আমানত আজ আমাদের প্রতিটি কাজের অনুসঙ্গ। দ্বীনের ঝা-া ওড়ানোর অবাস্তবায়িত কাজ আজ আমাদের শ্রেষ্ঠকর্ম। সম্পাদিত কর্মের চাইতে অসম্পাদিত কর্মই এখনো অনেক। শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা অর্জনে যদি ব্যর্থ হই হে আল্লাহ, সারাটি জীবন যেন শহীদদের অপূর্ণ কাজকে পূর্ণতা দিতে আমাদের প্রত্যেকে অহর্নিষ প্রচেষ্টায় নিরন্তর পথ চলতে পারি সে তৌফিক তুমি আমাদের সকলকে দাও। আমিন। 
সে গুলো স্মরণ করলে নিজের অজান্তেই চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে। আর ‘মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করি তুমি আমার এই প্রিয় ভাইদের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দাও মাবুদ।’
১৪ জানুয়ারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আরবী বিভাগের ১ম বর্ষের মেধাবী ছাত্র সাইফুদ্দীন ছাত্রদলের সন্ত্রাসিদের আতর্কিত হামলায় আহত হন। হাতুড়ি ও রড দিয়ে থেতলে দেয়া হয় তার মাথা।
বগুড়া জেলার এরোলিয়া ইউনিয়নের ধাওয়াপিকশন গ্রামের ছেলে শহীদ সাইফুদ্দিন সংগঠনের কর্মী ছিলেন। শহীদ সাইফুদ্দিন ভাইয়ের শাহাদাতের কয়েকদিন পূর্ব থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে ছাত্রদল নামধারী সন্ত্রাসীদের মহড়া। অস্তিতিশীল হয়ে উঠে ক্যাম্পাস, আতঙ্কিত হয়ে উঠে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা। এমনি এক অবস্থার মধ্যে ১৪ জানুয়ারি ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা কাজলা এলাকার গেটে টেম্পু থেকে নামিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র সাইফুদ্দিনকে লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে রাস্তায় ফেলে প্রকাশ্য দিবালোকে উপর্যুপরি আঘাতের ফলে তাঁর মাথা চুর্নবিচুর্ন হয়ে যায়। তার ঘাড়ের রগ ও মগজ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অজ্ঞান অবস্থায় রাজশাহী মেডিক্যালে ভর্তির পর তার অবস্থা আরো অবনতি হতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগীতায় তাকে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দীর্ঘ ২ মাস ৯ দিন চিকিৎসার পর ২৪ এপ্রিল তিনি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেন।
১৩ জানুয়ারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গ-গোল শুরু হয় তখন ঢাকায় কার্যকরী পরিষদের অধিবেশন চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গ-গোলের খবর পেয়ে অধিবেশন থেকে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি জনাব সেলিম উদ্দিন আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য ছুটি দেন। ফোনের পর ফোন আসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রেজাউল ভাই দ্রুত চলে আসেন। কেন্দ্রীয় সভাপতি বলল দেখেন বিমানের টিকেট পেলে দ্রুত চলে যান। বিমানের টিকেট না পেয়ে বাসে রওয়ানা হলাম। আমার সাথে রাজশাহী মহানগরীর সাভাপতিও আছেন গাড়ীতে বসে কথা বলতে বলতে দুটি মোবাইলের চার্জই শেষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেক্রেটারী মাহবুবুল আলম সালেহী ভাইকে বললাম পরিস্থিতির আলোকে উপস্থিত দায়িত্বশীলদের আলোচনা করে আপনিই সিদ্ধান্ত দিবেন আল্লাহ ভরসা। আমি ৪ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পৌঁছলাম। গোটা পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু থমথমে অবস্থা মনেহয় যেকোন মুহূর্তে কিছু একটা হবে। আমরা আমাদের জনশক্তিকে বিচ্ছিন্নভাবে চলাফেরা না করতে বলি। কারন সন্ত্রাসীরা এখন পরাজিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাহিরে চোরাগোপ্তা হামলা চালাতে পারে; এটা আমাদের আশঙ্কা দেখাগেল পরের দিন ঠিকই কাজলা গেটে একা পেয়ে শহরে যাবার সময় সাইফুদ্দীন ভাইকে তারা অত্যান্ত নির্মম ও পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করে। কিন্তু হত্যা করে যেমনি আদর্শকে পরাজিত করা যায় না তেমনি অস্ত্র ও পেশী শক্তি দিয়েও বেশি দিন টিকিয়ে থাকা যায় না এটাই প্রমানিত সত্য এবং পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ধৈর্য।
শহীদ সাইফুদ্দীন ভাইয়ের শাহাদাতের পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের এখানে ছাত্র ছাত্রীদের অবিভাবক সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। সুতরাং আমরা সবার আশঙ্কাকে ভুলে পরিনত করবই না বরং দৃষ্টান্ত স্থাপন করব এভাবে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরকে আল্লাহ এতটুকু শক্তি দিয়েছে তারা ইচ্ছা করলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস বন্ধ রাখতে পারে মাসের পর মাস। কিন্তু সেই ছাত্রশিবিরের কর্মী শাহাদাতের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয় খোলা থাকবে, ক্লাস পরীক্ষা চলবে এমনকি সাইফুদ্দীদ্দন ভাই যে দিন শাহাদাত বরন করছে সেই দিন তার জানাযায় ছাত্র শিক্ষকেরা ক্লাস এবং পরীক্ষা শেষে অংশগ্রহণ করে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নজির বিহীন ঘটনা। জানাজা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালিন ভাইস চ্যান্সেলর ফাইসুল ইসলাম ফারুকী তার বক্তৃতায় বললেন “ছাত্রশিবিরের কর্মী শাহাদাত বরন করল, আর সেই দিনও বিশ্ববিদ্যালয়ে কøাস, পরীক্ষা সব হয়েছে। যে বিরল ইতিহাস ছাত্রশিবির আজ কায়েম করল তা সত্যেই প্রশংসার দাবিদার। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হল তার পরবর্তী চিত্রটি দেখার জন্য ধৈর্য ধারন করে সেই দৃষ্টান্তটি দেখলাম।” আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ছাত্রদলের কাউকে আমরা কিছু বলবনা। তাদের অপরাধ তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য করেছে। শুধু তাই নয় কাজলায় যে জায়গায় শহীদ সাইফুদ্দীনকে শহীদ করা হলো আর যেখানে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ছাত্রদল তাদের অভ্যন্তরীন কোন্দলে রক্তাক্ত হয়েছে ৪/৫ বার। শহীদ সাইফুদ্দীনের জানাযার দৃশ্য আজো আমার মনে পড়লে আজো আবেগ আপ্লত হয়ে পড়ি। বিশেষ করে শহীদ সাইফুদ্দীন ভাইয়ের গর্বিত পিতার আবেগময় সেই বক্তব্য, তিনি বলেছিলেন “সম্মানিত শিক্ষক মন্ডলী আমি আমার কলিজার টুকরাকে আপনাদের কাছে মানুষ বানানোর জন্য পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু তার পরিবর্তে আপনারা কফিন নিয়ে হাজির হলেন।” শহীদ সাইফুদ্দীন খুব মেধাবী ছিলেন। ১ম বর্ষের যে কয়েকটি বিষয়ে তিনি পরীক্ষা দিয়েছিলেন তার শাহাদাতের পর পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে দেখা গেল সবগুলোতে এ+ পেয়েছেন। আল্লাহর নিকট দোয়া করি শহীদ সাইফুদ্দীন যেন দুনিয়ার পরীক্ষাগুলোর মত পরকালেও উত্তম মর্যাদা লাভ করেন।
শহীদ হাফিজুর রহমান শাহীন ভাইয়ের সাথে পরিচয় আমার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হওয়ার পর থেকেই। ১৯৯৬ সালে ১ম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর কিছু দিন হলে থাকি এর পর সংগঠন আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় পাশ্ববর্তী এলাকা মেহেরচন্ডী সভাপতির দায়িত্ব দেয়। আর হাফিজুর রহমান শাহীনের বাসা মেহেরচন্ডী। শাহীন ভাইয়ের পরিবার ও চাচারা বেশ প্রভাবশালী হওয়ায় এটি ছিল অনেকটাই আমাদের কেন্দ্র। তখন থেকে শাহীন ভাইয়ের দিকে এলাকার প্রতিপক্ষের নজর কারন শাহীন ভাই একদিকে ছিল স্থানীয় প্রভাবশালী আবার শারিরীকভাবেও নজর কাড়ার মত সুন্দর ও সুঠাম দেহের অধিকারী। আর ঐ এলাকা মদখোর ও গাজাখোরদের আড্ডাখানা হওয়ায় শাহীন ভাই এলাকার যুবকদের নিয়ে ছিলেন এ সবের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ফলে সব মিলে শাহীন ভাই বনে যান বাতিলের জন্য চক্ষুশুল হিসেবে। আমার স্মৃতিতে রয়েছে শহীদ শাহীন ভাইয়ের জীবনের অনেক ঘটনা লেখার কলেবর আর বৃদ্ধি করতে চাই না বলে সংক্ষেপে শেষ করতে চাই। ২০০৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সফরে যাই। প্রোগাম শেষে দেখি আমার থাকার রুমে একটি দরখাস্ত হাতে শাহীন দাড়িয়ে আছে, সালাম দিয়ে হাত বাড়িয়ে বলল একটি দরখাস্ত আপনার কাছে পড়ে দেখি শহীদ শরিফুজ্জামান নোমানী ভাইয়ের নামে ফাউন্ডেশন ছাত্রকল্যান ও সমাজকল্যান কাজের অনেক পরিকল্পনার বর্ণনা দরখাস্ত পড়ে হাসতে হাসতে বললাম বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতির সাথে আলাপ ছাড়াই কেন্দ্রীয় সভাপতির নিকট টাকার দরখাস্ত। মৃদু হেসে বলল আপনি কেন্দ্রীয় সভাপতি হলেও আমার সেই রেজাউল ভাই না। আল্লাহর কাছে এখন দোয়া করি শহীদ ভাই পরকালেও যেন আমাদের এভাবে কাছের হিসেবে মনে রাখে।
পরিবারে বড় সন্তানকে হারিয়ে শাহীন ভাইয়ের বাবা-মা প্রায় পাগলপারা। শাহীন ভাইয়ের শাহাদাতের পর মাকে ফোন দিয়েছিলাম। সালাম দেয়ার পর দু এক কথা বলতে বলতে শুধু বুক ফাটা কান্নার আওয়াজ একপর্যায়ে আর কোন শব্দ নেই। অনেকক্ষন আমি মোবাইল ধরে বসে আছি এরপর একজন ফোন ধরে বলল মা অজ্ঞান হয়ে গেছে। আজো মনে হয় সেই কান্নার আওয়াজ কানে ভেসে আসছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এখন শহীদ সাব্বির শহীদ আজিবর আর শহীদ শাহীনের কবর দিয়ে ঘেরা। আর এই ক্যাম্পাস থেকে ইসলামী আন্দোলনের মুলোৎপাটন করা পৃথিবীর কোন শক্তির পক্ষে সম্ভব নয়।

লেখক: সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সহকারী সম্পাদক সাপ্তাহিক সোনার বাংলা,
 সৎশধৎরসথ৮০@ুধযড়ড়.পড়স