ঢাকা, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭, সোমবার রাত; ০৮:২৩:৫৯
  

ড. পিয়াস: সাহসী এক কণ্ঠস্বরের বিদায় - ড.মুহাম্মদ রেজাউল করিম

19 Oct 2014

জন্মিলেই মরতে হবে এটি অনিবার্য সত্য। তবুও কারো কারো বিদায়ে মানুষকে ব্যাপক নাড়া দেয় এবং প্রচন্ডভাবে ব্যাথিত করে।

 জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সাহস, আর মানবপ্রেমের মাঝে তারা বেঁচে থাকেন যুগ-যুগ ধরে। এমনই একজন স্বনামধন্য ও দেশ বরেণ্য শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. পিয়াস করিম। গত ১৩ অক্টোবর সোমবার ভোরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, রাজনৈতিক মহলসহ সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর নীরবে চলে যাওয়া আজ কাঁদায় অনেককে। জানাজায় হাজার হাজার লোকের সমাগম ড.পিয়াসকে আরো স্মরণীয় করে রাখবে।

পিয়াস করিম ছিলেন অবদমিত। তাঁর বক্তব্য ছিল সাহসী, যুক্তিপূর্ণ, তেজস্বী, বলিষ্ঠ ও সুনিপুণ। খুব সহজ-সরল ভাষায় মানুষের হৃদয়ের কথা বলতেন তিনি। এজন্য অল্প সময়ে লক্ষ-কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর বিদায়ে নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষরুপী অনেককে আনন্দ দিলেও হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে দেশপ্রেমিক নাগরিকদের।

শহীদ মিনারের তথাকথিত ইজারাদাররা মৃত্যুর পরেও তাঁকে নিয়ে বিষবাস্প ছড়ানোর ঘৃণ্য আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। মৃত্যুর মত মর্মস্পর্শী বেদনাও তাদেরকে জঘণ্য আক্রমণ থেকে যেন বিরত রাখতে পারছেনা।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পিয়াস করিম ২৩ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিয়াস করিমের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। তার আসল নাম ড. মঞ্জুরুল করিম। পিয়াস তাঁর ডাক নাম। পরবর্তীতে এ নামেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন। ড. পিয়াস করিম ১৯৭৩ সালে কুমিল্লা জেলা স্কুল থেকে এসএসসি ও ১৯৭৫ সালে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি একাধারে রাজনৈতিক অর্থনীতি, রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক তত্ত্ব বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ছিলেন।

দেশবরেণ্য এই টকশো আলোচক ২০০৭ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতা করেন। তিনি কারনি নব্রোস্কা বিশ্ববিদ্যালয় ও মরিসৌরি কালভার-স্টকটেন কলেজে ১৭ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সর্বশেষ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড সোস্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন তিনি। মৃত্যুর আগ র্পযন্ত নাগরিক সমাজ নিয়ে কাজ করে গেছেন ড.পিয়াস করিম। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর বিভিন্ন জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে।

চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে পিয়াস করিম ছিলেন পঞ্চম। তাঁর বাবা মরহুম অ্যাডভোকেট এম এ করিম। পিয়াস করিমের স্ত্রী ড.আমেনা মহসিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। তিনিও টকশো’র জনপ্রিয় আলোচক হিসাবে খ্যাত। পিয়াস করিমের ছেলে দ্রাবিড় করিম এ-লেভেল পরীক্ষার্থী। পিয়াস করিম ছাত্রজীবনে লেখক শিবিরের সাথে জড়িত ছিলেন। পাশাপাশি বিশিষ্ট চলচিত্র নির্মাতা মরহুম তারেক মাসুদের সাথে শর্ট ফিল্ম তৈরি ও অন্যান্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন টেলিভিশনের সাম্প্রতিক বিষয়ের টকশো‘তে অংশ নিয়ে পিয়াস করিম সারা দেশে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন।

“Intellectual” শব্দটির যথার্থ বাংলা অর্থ ‘বুদ্ধিজীবী’ কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে ড. পিয়াস করিম যে বুদ্ধিজীবি এতে কোন সন্দেহ নেই। বুদ্ধিজীবীর সর্বজনীন সংজ্ঞা দাঁড় করানো হয়েছে---An intellectual is a person who uses his or her intellect to work, study, reflect, speculate on, or ask and answer questions with regard to variety of different ideas. বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব আসলে কী? সে সম্পর্কে এ সময়ের আরেক আলোচিত বহুমাত্রিক বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কিও আলোচনা করেছেন।

তিনি Dwight Macdonald-এর প্রকাশিত একগুচ্ছ প্রবন্ধের প্রসঙ্গ টেনেছেন। জার্মান কিংবা জাপানি যুদ্ধের বাস্তবতায় যেখানে নাৎসি বর্বরতা এবং হিরোশিমা-নাগাসাকির ধবংসযজ্ঞ অনিবার্যভাবে আমাদের ব্যথিত করে এবং মনোযোগ কেড়ে নেয়। সে পরিস্থিতিতে বুদ্ধিজীবীর কাজ হচ্ছে সরকারের ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়া। সরকারের কাজের ভেতরকার উদ্দেশ্য এবং তার কারণ কী, সেগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া। অধ্যাপক পিয়াস সেই পবিত্র দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত বলিষ্ট এবং সততার সঙ্গে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, জালিম সরকারের সামনে সত্য কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ। ড.পিয়াস করিম অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজন প্রতিবাদী যোদ্ধা ছিলেন।

বর্তমান সময়ে দেশ ও জাতি এক কঠিন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের লেবাসে চলছে বাকশাল। ইলেকশানেরর নামে সিলেকশানের মাধ্যমে একটি অনির্বাচিত ও অবৈধ সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। এ সময়ে মানুষের মৌলিক অধিকার ভুলুন্ঠিত। ৯০% মুসলমানদের ঈমান আকিদা রক্ষার লড়াইয়ে, শাহবাগী নাস্তিকদের দূর্দান্ত প্রতাপের বিরুদ্ধে শির উঁচু” করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে ক’জন প্রতিবাদী হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি তাদের অন্যতম। কারণ অন্যায়, অবিচার ও জুলুমের প্রতিবাদ করে জীবনে দেওয়ার স্বার্থকতা তো এখানেই। মৌলিক বিশ্বাসের জায়গাকে অটুট রাখার লড়াইয়ে তাঁর প্রজ্ঞা, সাহসিকতা ও বাক্যচয়নের বাগ্মিতায় খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি চলে এসেছেন প্রথম কাতারে। রাষ্ট্রীয় যাঁতাকলে পিষ্ট ভীত সন্ত্রস্ত মজলূম জনতা তাঁর বলিষ্ঠ প্রতিবাদের সাহসী বক্তব্যের সাথে সাঁরিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেছে লক্ষ-লক্ষ জনতা। যে কয়েকটি মুখের সাহসী কণ্ঠস্বর বঞ্চিত মানুষকে আলোর হাতছানি দিতো ড.পিয়াস করিম তাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন সদাসর্বদা হাস্যোজ্জল। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর বক্তব্য ঘাঁ দিয়েছে শাসকগোষ্ঠীকে। এজন্য তিনি প্রচন্ডভাবে আক্রান্তও হয়েছিলেন। আর প্রচন্ড বেদনা নিয়ে হয়ত তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন বলে অনেকের আশঙ্কা। তাঁর কথা অনেককে প্রভাবিত করতো। ড.পিয়াস করিমের সকল মতামতের সাথে আমরা অনেকেই একমত না হলেও  তাঁর বলিষ্ঠতা গণতন্ত্র পুনরুদ্দার, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে আমাদেরকে প্রেরণা যোগাবে। সম্ভবত সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই ড.পিয়াস করিম ”মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে ছুটে এসেছিলেন প্রিয় মাতৃভূমির টানে। দেশের সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে ছিলেন অগ্রণী। এক র্পযায়ে ঝড় তোলেন টকশো’তে। তাঁর সাহসী কণ্ঠ সোচ্চার ছিল সব অন্যায় আর অনিয়মের বিরুদ্ধে। ক্ষমতাবানদের স্বভাবতই তা পছন্দ হয়নি। তবুও তিনি ছিলেন অটল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত থেমে গেছে সে কণ্ঠ।

গণতন্ত্র যদি অখন্ড অবসর, সুযোগ আর অনুশীলনের নিশ্চয়তা দেয় তবে বুদ্ধিজীবীকে অনিবার্যভাবেই ভুল ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। আদর্শ, শ্রেণীস্বার্থ এবং বর্তমান ইতিহাসের অখন্ড সত্যকে প্রকাশ করতে হবে। চমস্কি অবশেষে বলেন :ÒThe responsibilities of Intellectuals, there are much deeper than what macdonald calls the Òresponsibility of people,Ó given the unique privileses that intellectuals enjoy. (The Responsibility of Intellectuals, The New York Review of Books.) এই প্রসঙ্গেই চমস্কি তিন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত: এলাকা বিশেষজ্ঞ, দ্বিতীয়ত: সমাজতাত্ত্বিকগণ, যারা সামাজিক পরিবর্তন, উন্নয়ন, দ্বন্দ্ব এবং দ্বন্দ্ব নিরসন কিংবা বিপ্লব নিয়ে কথা বলেন এবং তৃতীয়ত: মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ বিষয়ে ধর্মতাত্ত্বিক, দার্শনিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে জননীতিকে যারা বিশ্লেষণ করেন।

বুদ্ধিজীবী হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যার সাধারণ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা আছে। এবং যার নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একান্ত নিজের উপরেই নির্ভর করতে হয়। ড.পিয়াস করিম জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিচরণ করেছেন একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে। গ্রামসির মতে, আজকের দিনে জ্ঞাচর্চার কাজে জড়িত যেকোনো ব্যক্তিমাত্রই বুদ্ধিজীবী। বুদ্ধিজীবী হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি জনগণের প্রতি ও জনগণের জন্য সোচ্চার এবং মতামত, মনোভাব, দর্শন উপস্থাপন ও গ্রন্থিবদ্ধ করতে বদ্ধপরিকর। আর সেই ব্যক্তি ছাড়া এই ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি লজ্জাজনক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে সক্ষম, বুদ্ধিজীবী সর্বজনীন নীতির উপর ভিত্তি করে এই কাজটি করেন। এই সব মানুষই বিশ্বশক্তি ও জাতির কাছ থেকে স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার সম্পর্কে সম্মানজনক ব্যবস্থার আশা করেন। এই মানদন্ডগুলোর কোনোরকম ব্যতিক্রম হলে তা পরীক্ষা করবার প্রয়োজন হয় এবং সাহসের সাথে তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়। বুদ্ধিজীবীরা হচ্ছেন, তাদের সময়ের তথ্য কিংবা প্রচারমাধ্যমে প্রকাশিত এবং গণরাজনীতির সাথে যুক্ত একটি চরিত্র।

জুলিয়ান বেন্দা’র বিখ্যাত বই The treason of the Intellectuals  এই ধারণা দেয়, বুদ্ধিজীবীর অস্তিত্ব পৃথিবীর সর্বত্র। জাতীয় সীমানা কিংবা নৃতাত্ত্বিক আত্মপরিচিতির দ্বারা তাদের পরিধি সীমাবদ্ধ নয়। সরকারগুলো এখনও জনগণকে শোষণ করে, সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে আদালত ব্যর্থ হয়েছে।                                             

বুদ্ধিজীবী অনেকটা জাহাজডুবি মানুষের মতো। যিনি জানেন কিভাবে তাকে ডাঙ্গায় উঠতে হয়। বিষয়টা কোনোভাবেই রবিনসন ক্রুসোর মতো নয়, কেননা তার লক্ষ্য ছিল, ক্ষুদ্র দ্বীপকে তার উপনিবেশ বানানো। এ বিষয় অনেকটা মার্কো পোলোর মতো-যার চিন্তা ছিল, কখনো ব্যর্থ না হওয়া। টার্জেনেভের বাজারভ অথবা জেমস জয়েসের স্টিফেন দেদালুসের মতো বুদ্ধিজীবীরা, যারা নিঃসঙ্গ স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন, তাদেরকে সমাজের সাধারণের সাথে মেলানো যেত না এবং ফলে তারা ছিলেন প্রচলিত মতের বিরুদ্ধে। বিংশ শতাব্দীতে বেতনভুক্ত ব্যবস্থাপক, সাংবাদিক, গণনাকারী বা সরকারি বিশেষজ্ঞ, তদ্বিরকারী, পন্ডিত, প্রাবন্ধিক, উপদেষ্টা ও নর-নারীর সংখ্যা এমনভাবে বাড়তে থাকে যে নিরপেক্ষ মতপোষণকারী হিসেবে কোনো বুদ্ধিজীবী আদৌ থাকতে পারে কিনা-তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়।

সম্প্রতি শাহবাগে নাস্তিকতাবাদের উত্থানের মধ্য দিয়ে সেটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কারণ এদেশের মানুষ শাহবাগে ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের দেখেছে। যারা ফ্যাসিবাদী কায়দায় হত্যা, অন্যায়, অবিচারের নেতৃত্ব দিয়েছে। উস্কানি দিয়ে গোটা জাতিকে করেছে বিভক্ত। তারাও কিন্তু এসমাজের তথাকথিত সুশীল ও বুদ্ধিজীবী হিসেবেই খ্যাত। কিন্তু ড.পিয়াস করিম এর মত দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীরা তাদের চক্ষুশূল এবং আক্রমণের শিকার হয়েছেন অনেকবার। আর অনেক ব্যথা-বেদনা এবং অভিমান নিয়ে একান্ত নিভৃতে এই ধরা ছেড়েছেন।

বিদায়! ড.পিয়াস করিম বিদায়! জাতি আপনাদের মত শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণীয় করে রাখবে যুগ-যুগ ধরে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রিয়াজ ফেইসবুকে লিখেছেন, প্রবাস জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনা যখন হাজার মাইল দূরের ফেলে আসা দেশ থেকে দুঃসংবাদ আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে; যখন জানান দেয় যে, হারিয়েছি প্রিয়জন বা বন্ধুকে। তখন বোঝা যায় দুঃসংবাদ বইবার ভার কতটা কঠিন। তখন মনে পড়ে শেষ কথাগুলো কবে বলা হয়েছিল; কি কথা হয়েছিল; কি কথা বলা হয়নি, কি কথা বলা দরকার ছিল। এক সময় কাছের মানুষ ছিল যারা, ভূগোলের দূরত্ব যাদের দূরে ঠেলে দিয়েছে, তাদের নতুন-পুরনো স্মৃতি জেগে ওঠে; সেটা আমার ইচ্ছা নিরপেক্ষ। ১৯৭৯ সালের দিকে পরিচয়, সে তো অনেক দিনের কথা। তারপরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সময় গেছে, আবার যোগাযোগ তৈরির সময় গেছে; দেখা হওয়ার সময় গেছে, না দেখার সময় গেছে। কিন্তু দেখা হলে কথা তো শুরু হয়েছে সেখান থেকেই যেখানে আমাদের শেষ কথা হয়েছিল। ঐকমত্যের ভিন্নমতে আমরাতো বন্ধুই থাকি। সেই বন্ধুত্বের দাবিতে বলতেই পারি এটা যাওয়ার সময় নয়। গত বছর অক্টোবরে ওয়াশিংটনে আমাদের ভিন্নমতের যে আলোচনাটা শুরু এখনও তা শেষ হয়নি। পিয়াস করিম, এখন তোমার যাওয়ার সময় ছিলো না।

কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে এই ক্ষণজন্মা বুদ্ধিজীবী সমাজের অসংঙ্গতি নিয়ে সমালোচনা, পর্যালোচনা ও এর দায়ভার নিয়ে যেভাবে কথা বলেছেন তা খুবই বিরল। তাঁর চলে যাওয়াকে তিনি সার্থকতায় রূপায়িত করে রেখে গেছেন খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে। আমার মত ক্ষুদ্র মানুষ ভিতরের পিয়াস করিমকে আবিষ্কার করতে না পারলেও স্বল্প সময়ে দেশ-জাতির কল্যাণে অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে মজলুম নির্যাতিত, বঞ্চিত, লাঞ্চিত, পদদলিত ও সত্যপন্থিদের পক্ষে তিনি যেভাবে দেয়াল হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন, এজন্যই তাঁর বিদায়ে লক্ষ-লক্ষ মানুষের মতো অশ্রুসিদ্ধ হয়েছে আমারও।

তিনি হামলা, রক্তচক্ষু, অশালীন বক্তব্যকে মোকাবেলা করে হয়ে গেছেন সাহসের বীরপুরুষ। দেখিয়েছেন অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে কিভাবে সংগ্রাম করতে হয় তাও। আজকের তরুণ প্রজন্ম সেই দীক্ষা নিয়েই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে অনেকদিন। তাঁর ন্যায় ইনসাফপূর্ণ বক্তব্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বলিষ্ঠ সাহসী উচ্চারণ অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি আমরণ যেভাবে লড়াই করেছেন দেশ, জাতি, গণতন্ত্র ও ইসলামের পক্ষে এ জন্য আল্লাহ তাঁকে এর উত্তম প্রতিদান দান করুন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর পরিবারকে এই শোক বহন করার শক্তি দান করুন। অতীতের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাত নসীব করুন। আমীন।

http://www.sheershanews.com/2014/10/19/54914